মাঝখানের দিনগুলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৪ অক্টোবর ২০২৬
সেদিন হাসপাতালে বসে একজন আত্মীয়কে ফোন করেছিলাম। খুব বেশি কিছু বলার ছিল না। শুধু জানতে চেয়েছিলাম, একটু সময় হবে কি না। হাসপাতালের বারান্দায় একা বসে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল, পরিচিত কেউ পাশে থাকলে ভালো লাগত।
ফোনটা কয়েকবার বেজে কেটে গেল।
কিছুক্ষণ পর একটা বার্তা এল, “একটু ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলব।”
আমি লিখলাম, “আচ্ছা।”
তারপর ফোনটা পকেটে রেখে দিলাম।
হাসপাতালের বারান্দায় তখন মানুষের ভিড়। আমার পাশের বেঞ্চে একজন বৃদ্ধ বসেছিলেন। তাঁর হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ, ভেতরে কয়েকটা ওষুধের পাতা। বারবার ব্যাগটা খুলে দেখছিলেন। কিছুক্ষণ পর একজন তরুণ এসে তাঁর পাশে বসল। বৃদ্ধ মানুষটি ছেলেটার হাতে ব্যাগটা দিয়ে নিশ্চিন্তে দেয়ালে হেলান দিলেন।
আমি ফোনটা আবার বের করলাম।
যোগাযোগের তালিকায় অনেক নাম। পরিচিত মানুষ, আত্মীয়স্বজন, পুরোনো বন্ধু। আঙুল দিয়ে নামগুলো ওপর-নিচ করলাম। কয়েকটা নামের কাছে এসে থামলামও। তারপর ফোনটা বন্ধ করে রাখলাম।
সন্ধ্যায় হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশের দোকানে চা খেতে দাঁড়ালাম। দোকানদার চিনি একটু বেশি দিয়েছিলেন। সাধারণত হলে বদলে দিতে বলতাম। সেদিন কিছু বলিনি। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
বাড়ি ফিরে দেখি, ফোনে কয়েকটা বার্তা এসেছে। একটা ব্যাংকের, দুটো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন। যে ফোনটার অপেক্ষায় ছিলাম, সেটা আসেনি।
অবশ্য তিনি সত্যিই ব্যস্ত থাকতে পারেন। তাঁর নিজের সংসার আছে, কাজ আছে, সমস্যাও থাকতে পারে।
তবু মনে হচ্ছিল, পরে কি একবারও সময় হয়নি?
কয়েক মাস পর পরিবারের একটা বিয়েতে তাঁর সঙ্গে দেখা।
অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকতেই দূর থেকে ডাকলেন, “এই যে! কোথায় থাকো আজকাল?”
কাছে যেতেই জড়িয়ে ধরলেন। আমার শরীরের খোঁজ নিলেন, পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করলেন। তারপর পাশে দাঁড়ানো একজনকে বললেন, “আমাদের খুব কাছের মানুষ।”
সেদিন তাঁকে দেখে সত্যিই ভালো লেগেছিল। পুরোনো পরিচিত মুখ, পরিচিত হাসি। কিছুক্ষণ গল্প করতে করতে হাসপাতালের ঘটনাটা মনেও ছিল না।
খাবারের টেবিলে বসে এক আত্মীয়ের পুরোনো একটা কাণ্ড নিয়ে এমন হাসাহাসি হলো যে আমার চোখে পানি এসে গেল। অনেক দিন পর এতটা হেসেছিলাম।
তারপর হঠাৎ তিনি বললেন, “তোমার সঙ্গে তো কত দিন ভালো করে কথা হয় না!”
আমি পানির গ্লাসটা নামিয়ে রাখলাম।
কথাটা ঠিকই বলেছেন। অনেক দিন কথা হয়নি।
ইচ্ছে করছিল বলি, সেদিন হাসপাতালে বসে তোমাকে ফোন করেছিলাম। তুমি বলেছিলে পরে কথা বলবে।
বললাম না।
বিয়েবাড়িতে এসব কথা তুলতে ভালো লাগছিল না। তা ছাড়া এত দিন পর পুরোনো একটা বার্তার হিসাব চাইতে যাওয়াটাও কেমন যেন মনে হলো।
অনুষ্ঠান শেষে একসঙ্গে ছবি তুললাম। ছবিতে আমার কাঁধে তাঁর হাত। দুজনেই হাসছি।
ছবিটা খারাপ আসেনি।
বাড়ি ফিরে ছবিগুলো দেখতে গিয়ে মনে হলো, একটা ছবিতে কত সহজে সম্পর্কের সুন্দর মুহূর্ত ধরে রাখা যায়। অথচ সেই সম্পর্কের মাঝখানে যে দীর্ঘ সময়টা কেটে যায়, তার কোনো ছবি থাকে না।
হাসপাতালের বারান্দায় বসে থাকা মানুষটার ছবি কেউ তোলেনি। মাসের শেষে ওষুধ আর সংসারের খরচ মেলাতে না পেরে যে রাতগুলো কেটেছে, সেগুলোরও কোনো ছবি নেই।
অথচ বিয়ের অনুষ্ঠানে সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যায়। দূরের আত্মীয়ও আসেন, পুরোনো অভিমান ভুলে অনেকে পাশাপাশি বসেন। খাবার নিয়ে অভিযোগ হয়, হাসাহাসি হয়, কে কত বড় হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা চলে।
সেদিন মনে হয়, পরিবারটা বেশ বড়।
এই বড় পরিবারটাকে বিপদের দিনে কোথায় খুঁজব, সেটা অবশ্য বিয়ের অনুষ্ঠানে বোঝা যায় না।
কিছুদিন পর এক আত্মীয়ের মৃত্যুর খবর পেলাম।
তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দেখি, উঠানজুড়ে মানুষ। অনেকের সঙ্গে বহুদিন পর দেখা। একজন আমাকে দেখে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন। আরেকজন জানতে চাইলেন, শরীর কেমন আছে।
ঘরের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ আসছিল। মৃত মানুষটির ছেলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বারবার ফোন ধরছিল। কখনো দাফনের ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছে, কখনো দূর থেকে আসা আত্মীয়দের পথ বুঝিয়ে দিচ্ছে।
ছেলেটার মুখে ক্লান্তি।
বাবার অসুস্থতার সময়েও তাকে অনেক দৌড়াতে দেখেছি। তখন হাসপাতাল আর বাড়ির মধ্যে তার দিন কেটেছে। চিকিৎসার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। একদিন দেখা হলে বলেছিল, “কী যে করি, বুঝতে পারছি না।”
সেদিন তাকে কী বলেছিলাম, এখন আর মনে নেই।
এই কথাটা মনে পড়তেই নিজের ওপর একটু অস্বস্তি হলো। আমি নিজেও কি তার বিপদের সময় যথেষ্ট পাশে ছিলাম? একদিন খোঁজ নেওয়া আর সত্যিকার অর্থে পাশে থাকা কি এক?
অন্যদের অনুপস্থিতির হিসাব করতে গিয়ে নিজের উপস্থিতির হিসাবটা কখনো কখনো বাদ পড়ে যায়।
মৃত মানুষটির ঘরে ঢুকে দেখি, তাঁর বিছানাটা গুছিয়ে রাখা হয়েছে। পাশে একটা চশমা। চশমার একপাশের ডাঁটি কালো সুতো দিয়ে বাঁধা।
ওটা দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
মানুষটা বেঁচে থাকতে এই চশমা পরেই হয়তো খবরের কাগজ পড়তেন। কারও সঙ্গে কথা বলতেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানায় বসে থাকতেন। তখন তাঁর পাশে কতজন বসার সময় পেয়েছিলেন, জানি না।
আজ বাড়িভর্তি মানুষ।
ফেরার সময় উঠানে কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হলো। তাঁরা নিজেদের কাজের ব্যস্ততার কথা বলছিলেন। একজন অনেক দূর থেকে এসেছেন। আরেকজন জরুরি কাজ ফেলে ছুটে এসেছেন।
তাঁদের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ করার কারণ নেই। মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে আসাও তো সহজ নয়।
তবু মনে হচ্ছিল, মানুষটা বেঁচে থাকতে এই ভিড়ের সামান্য অংশও যদি কখনো তাঁর ঘরে বসত, হয়তো শেষ দিনগুলো একটু অন্য রকম হতো।
বিয়ে আর মৃত্যুর দিনে আত্মীয়দের উপস্থিতি চোখে পড়ে। মাঝখানের দিনগুলোয় কে কতবার খোঁজ নিয়েছেন, তার কোনো ছবি থাকে না। হাসপাতালের সেই বেঞ্চ, ওষুধের দোকানের বিল, রাতের বেলা সাহায্য চেয়ে করা ফোনগুলো পারিবারিক অ্যালবামে জায়গা পায় না।
বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ সেই চশমাটার কথা মনে পড়েছিল।
আত্মীয়তা নিয়ে আমার ভাবনাগুলোও ধীরে ধীরে বদলেছে।
একসময় মনে করতাম, রক্তের সম্পর্ক থাকলেই বিপদের সময় মানুষ পাশে দাঁড়াবে। এখন বুঝি, সম্পর্কের পরিচয় আর সম্পর্কের ব্যবহার সব সময় এক হয় না।
আমার এমন আত্মীয়ও আছেন, যাঁদের নিজেদের সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তবু অসুস্থতার খবর শুনলে ফোন করেন। কিছু দিতে পারেন না, কিন্তু কথা বলেন। প্রয়োজন হলে নিজের কাজ ফেলে একটু সময় বের করেন।
আবার এমন মানুষও আছেন, যাঁদের সঙ্গে অনুষ্ঠানে দেখা হলে মনে হয় সম্পর্কটা কত ঘনিষ্ঠ! অথচ প্রয়োজনের সময় তাঁদের কাছে পৌঁছানো কঠিন।
আগে এতে খুব রাগ হতো। এখন রাগের চেয়ে দ্বিধা বেশি কাজ করে।
কারণ কাউকে সরাসরি দোষ দেওয়ার আগে মনে হয়, আমিও কি সবার বিপদে পৌঁছাতে পেরেছি? কোনো আত্মীয়ের ফোন কি ব্যস্ততার কারণে ধরিনি? পরে কথা বলব বলে ভুলে গেছি?
হয়তো করেছি।
তাহলে অন্যের কাছে যে প্রত্যাশা রাখি, নিজের ক্ষেত্রেও সেই হিসাবটা রাখা দরকার।
তবু একটা পার্থক্য থেকে যায়। সব সময় সাহায্য করা সম্ভব নয়, কিন্তু খোঁজ নেওয়ার ইচ্ছেটুকু অনেক সময় প্রকাশ করা যায়। বিপদের দিনে কেউ পাশে দাঁড়াতে না পারলেও পরে জানতে পারেন, মানুষটা কেমন আছেন।
সেই ছোট্ট খোঁজটুকু না থাকলে সম্পর্কটা ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
এখন কোনো বিয়েতে গেলে সবার সঙ্গে কথা বলি। আনন্দ করি। পরিচিত মুখ দেখলে ভালোও লাগে। কারও মৃত্যুর খবর পেলে যাওয়ার চেষ্টা করি। এসব আয়োজনের মধ্যেও সম্পর্কের একটা জায়গা আছে, সেটা অস্বীকার করি না।
শুধু বুঝেছি, জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলো অনুষ্ঠানের তারিখ দেখে আসে না।
সেদিন কোনো নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় না। কারও জন্য আলাদা আসন রাখা থাকে না। মানুষ নিজের অসহায় অবস্থায় পরিচিত একটা নম্বরে ফোন করে, তারপর অপেক্ষা করে।
কয়েক দিন আগে পুরোনো ছবিগুলো দেখতে গিয়ে সেই বিয়ের ছবিটা আবার চোখে পড়ল।
আমার কাঁধে আত্মীয়ের হাত। দুজনের মুখেই হাসি।
ছবিটা দেখতে দেখতে মনে হলো, সেদিনের হাসিটা মিথ্যা ছিল না। মানুষটার সঙ্গে আমার সম্পর্কও মিথ্যা নয়। শুধু সম্পর্কটার এমন কিছু ফাঁকা জায়গা আছে, যেগুলো ছবিতে দেখা যায় না।
ফোনে তাঁর সঙ্গে পুরোনো কথোপকথনটা খুললাম।
“একটু ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলব।”
তার নিচে আমার ছোট্ট উত্তর।
“আচ্ছা।”
বার্তাটা মুছে দিতে গিয়েও দিলাম না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।