নিরব অত্যাচার: ধাক্কা, অর্থহীনতা ও নিপীড়িত পুরুষ
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণঃ বিশ্লেষণ + এক্সপোজার প্রবন্ধ
তারিখঃ ০৭ অক্টোবর ২০২৫
গৃহহিংসার আলোচনা প্রায়শই শোনায় নারী-শিশু, কারণ বাস্তবেই তারা বেশি প্রকাশ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে একটি ভুল ধারণা বিরাজ করে—“পুরুষ নির্যাতিত হতে পারে না”।
নিরব অত্যাচার (silent abuse) — অর্থাৎ শারীরিক আঘাত না দিয়ে নিয়ন্ত্রণ, উপেক্ষা, শোষণ, অবমূল্যায়ন—ও একটি শক্তিশালী ধরন।
মানুষকে ধীরে ধীরে এমন একটি মানসিক শিকলবন্দি করে ফেলা হয়, যেখানে কণ্ঠরোধ, আত্মবিশ্বাস দুর্বলতা, নিজেকে অপর্যাপ্ত বোধ করানো—সবই ঘটতে পারে।
তথ্য ও গবেষণা থেকে আলোঃ
বাংলাদেশে ডমেস্টিক অ্যাবিউজ এ্যাগেইনস্ট মেন (Domestic Violence against Men) নিয়ে তথ্য সীমিত হলেও খবর প্রকাশ করে যে, অনেক পুরুষই মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হন।
একটি গবেষণা দেখায় যে, “silent treatment” বা ইগনোরেন্স (কথা বলা বন্ধ রাখা) কখনো কখনো emotional abuse হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণার সঙ্গে যুক্ত।
“Gaslighting” বা mental manipulation — যেখানে একজন নির্যাতক অপরজনকে ভুল বোঝাতে থাকে, স্মৃতি বিকৃত করে — নিরব অত্যাচারের একটি অত্যন্ত চাতুর উপাদান।
গবেষণায় দেখা গেছে, গৃহ হিংসার ঘটনায় মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশই আইনগতভাবে রিপোর্ট হয়।
বাংলাদেশে National Trauma Counselling Centre (NTCC) গৃহ হিংসার শিকারদের জন্য একটি সরকারি কাউন্সেলিং কেন্দ্র, যা মানসিক সহায়তা ও পরামর্শ দেয়।
বিশ্লেষণ: কেন এটি ঘটে ও কেন ধরা পড়ে নাঃ
১. লিঙ্গধারণা ও সামাজিক প্রবলতা
পুরুষদের প্রতি সাধারণ ধারণা হলো—“শক্ত, স্থিতশীল, ভুল করলেও ক্ষমা করতে পারে”। এই ধারণা নিরব অত্যাচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং শিকার পুরুষরা ভয় পান, “কে বলবে, কেউ বিশ্বাস করবে কি?”
২. ভাবিক অর্থহীনতা ও অনুভূতির দূরত্ব
নিরব অত্যাচার অপরাজিত থাকে কারণ এতে বাহ্যিক চিহ্ন থাকে না। কারো চিৎকার শোনা যায় না, চোখে চোখের লড়াই হয় না; কীভাবে বোঝবেন কেউ রোজ আপনাকে কণ্ঠরোধ করছে?
৩. মনস্তাত্ত্বিক ধ্বংস
নির্বাসিত অনুভব, অবমূল্যায়ন, উপেক্ষা—এসব এক এক করে আত্মমর্যাদা ধ্বংস করে।
গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে মানুষের মস্তিষ্ক “social exclusion” বা উপেক্ষার সময় সদৃশ অংশ সক্রিয় করে—অর্থাৎ, বাদ পড়ার অনুভূতি শারীরিক ব্যথার মতো অনুভব হয়।
৪. নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা সঞ্চালন
নিরব অত্যাচার মূলত শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ তৈরি করার উপায়। কথাবার্তা বন্ধ রেখে, পারস্পরিক বোঝাপড়া অকার্যকর করে, অপরজনকে চুপ করিয়ে রাখা—এই নিয়ন্ত্রণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
হৃদয়ে ধাক্কা: এক পুরুষের অভিজ্ঞতা (রূপক আখ্যান)
অভিক নামের এক পুরুষ ছিল — নামের মতো সাধারণ, পরিবারের ভিত্তি।
রাতে কাজ থেকে ফেরার পর, সে জানালো—বাজারে গেছি, কাল আসব।
তার স্ত্রী কোনো উত্তর দিল না।
পরের দিন রফিক জানতে পারল, তিনি ইংরেজিতে একটি দুই লাইনের প্রশ্নও জবাব দেননি—কথা বলা বন্ধ রেখেছে।
উপেক্ষা দিনের পর দিন বাড়ল— সে অনুভব করল, প্রতিবার প্রশ্ন করলে বৃষ্টির মতো শব্দ গলা থেকে ফিসফিস করে মুছে যায়।
কোনো চিৎকার নেই, কোনো ধাক্কার শব্দ নেই—কিন্তু ঘরভেদী অন্ধকার বড় হয়।
অভিক বুঝল—যে মানুষ তার স্বামী হওয়া উচিত ছিল, সেই গৃহেই তার কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে, তার অনুভূতির কথা “প্রয়োজন নয়” বলে ফেলা হচ্ছে।
সুপারিশ ও প্রতিকারঃ
গণমাধ্যম ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি
পুরুষ নির্যাতনের বিষয়কে “অসাধারণ নয়” হিসেবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সংবাদ মাধ্যম, সাহিত্য, আলোচনায় পুরুষ নির্যাতনের কেস নিয়ে আসা জরুরি।
কানুনে লিঙ্গ-নিরপেক্ষতাঃ
বাংলাদেশের আইন এখনও পুরুষ নির্যাতিতদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা দেয়নি। “Women and Children Repression Prevention Act” প্রধানত নারীর নিরাপত্তার কথা বলে।
আইনকে “person-neutral” বা লিঙ্গ-নিরপেক্ষ করে পুরুষদেরও সুরক্ষা দেওয়া যেতে পারে।
মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা ও থেরাপিঃ
NTCC-এর মতো counselling centre সম্প্রসারণ ও পুরুষদের জন্য বিশেষ সেশন চালু করা।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণঃ
লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার প্রতি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মডিউল চালু করা — যেখানে “silent abuse”, “emotional violence”, “gaslighting” ইত্যাদি বিষয় শেখানো হবে।
স্ব-সচেতনতা ও সমর্থন গ্রুপঃ
যারা নিরব অত্যাচার অনুভব করছেন, তারা গোপনভাবে একে অপরের সাথে কথা বলার গ্রুপ তৈরি করতে পারে। সহানুভূতি, অভিজ্ঞতা বিনিময়,এটি অনেক বড় শক্তি হতে পারে।
নিরব অত্যাচার — সেটা স্বামী হোক, পিতা হোক — শব্দহীন, দেখাহীন হলেও হৃদযন্ত্রে ধাক্কা দিয়ে যায়।
তথ্য বুঝিয়ে দেয়—purush-নিপীড়ন শুধু রোগ নয়, এটি আমাদের সমাজে সিঁড়ি সরিয়ে দেওয়া একটি প্রবণতা।
আমরা যদি সাহস করি — কথাবার্তা করি, আইন পরিবর্তন করি, সহায়তা বাড়াই —
তাহলে নিঃশব্দ কষ্ট আর থাকবে না—
তার পরিবর্তে ফিরে আসবে আলোর কণ্ঠ, মানবিক মর্যাদা, আস্থা।
#নিরবঅত্যাচার #পুরুষনিপীড়ন #গৃহনিপীড়ন #মানসিকনিপীড়ন #silentabuse #genderneutralrights #দৃষ্টিহীনক্ষতি #জাহিদহোসেন #সচেতনতা #মানবাধিকারেরগল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।