মানুষ জন্মের পর প্রথম যে অনুভূতিটি পৃথিবীকে জানান দেয়, তা হলো ক্ষুধা। জন্মের মুহূর্তে কান্না কেবল ফুসফুসের কার্যকারিতা নয়; এটি আসলে অস্তিত্বের ঘোষণা। শিশুর প্রথম কান্না পৃথিবীর সঙ্গে তার প্রথম সংলাপ, যেখানে ক্ষুধা হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য ভাষা। এই ভাষায় সে দাবি জানায়—“আমার বেঁচে থাকার অধিকার চাই।”
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ক্ষুধার রূপান্তর ঘটে। তা কেবল দুধ বা খাদ্যের জন্য সীমাবদ্ধ থাকে না। শিশুটি বড় হতে হতে খুঁজতে থাকে জ্ঞানের ক্ষুধা, আলোর ক্ষুধা, স্বপ্নের ক্ষুধা, সমৃদ্ধির ক্ষুধা। এই ক্ষুধাই মানুষকে সৃষ্টি করে, তাকে এগিয়ে যেতে শেখায়, তাকে সংগ্রামী করে তোলে। কিন্তু সেই সংগ্রামের পথ মসৃণ নয়—সামনে এসে দাঁড়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামাজিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় নীরবতা।
রাষ্ট্র—যাকে আমরা অভিভাবক ভাবতে চাই—সে প্রায়ই আকাশের মতো নিশ্চুপ থাকে। ক্ষুধার্ত মানুষের চিৎকার শোনার পরও নড়েচড়ে বসে না। বরং রাষ্ট্র অনেক সময় সমাজকে বিভাজনের পথে ঠেলে দেয়। অথচ চারপাশে দোল খায় সোনালি ফসল, ভরে ওঠে গুদামঘর। প্রশ্ন জাগে—কেন তবে কৃষকের সন্তান অনাহারে থাকে? কেন বীজ বুনেও সে ফসলের অধিকারী নয়?
এখানেই ক্ষুধা ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম করে। ক্ষুধা তখন কেবল এক ব্যক্তির আহার-সংকট নয়; তা হয়ে ওঠে এক সমষ্টির আর্তনাদ। কারণ ক্ষুধা কখনো একা থাকে না। ক্ষুধার যন্ত্রণা যেমন এক জনের শরীর কুরে খায়, তেমনি তা একদিন সমাজের গভীরে জমে থাকা অগ্নিতে পরিণত হয়। ক্ষুধা তখন বিদ্রোহে রূপ নেয়।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার অমর পঙ্ক্তিতে লিখেছিলেন—
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্য-শূন্য, পূর্ণিমার চাঁদ যদি ওঠেও আজ, তবুও তা আমাদের তৃষ্ণা মেটায় না।”
(তথ্যসূত্র: সুকান্ত ভট্টাচার্য, ছাড়পত্র, ১৯৪৭)
এই ক্ষুধা শুধু খাবারের অভাব নয়; এটি অধিকার থেকে বঞ্চনার প্রতীক। কর্মহীন মানুষের চোখে ক্ষুধা মানে কেবল দারিদ্র্য নয়—এটি রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্নচিহ্ন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী স্লোগান। প্রতিটি ক্ষুধার্ত পেট হয়ে ওঠে আগ্নেয়গিরির মতো, যা একদিন দাবানলে রূপান্তরিত হয়।
ইতিহাস আমাদের সামনে সেই সত্যই হাজির করে।
ফরাসি বিপ্লবের অগ্নিশিখা জ্বলেছিল রুটির অভাবে।
বাংলার তেভাগা আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ফসলের ন্যায্য হিস্যার দাবি থেকে।
ভারতবর্ষের নকশালবাড়ির আন্দোলনও ক্ষুধার বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
এই সমস্ত আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল ক্ষুধা, যা ব্যক্তিগত বেদনা থেকে সমষ্টিগত চেতনায় রূপ নিয়েছিল। ক্ষুধা মানুষকে শুধু প্রতিবাদী করে তোলেনি, দিয়েছে নতুন সমাজ গড়ার প্রেরণা।
আজও পৃথিবীর আকাশে সিঁদুরে মেঘ জমছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO, ২০২৪) রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীতে এখনও ৭০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ ক্ষুধার্ত। অথচ পৃথিবীর মোট খাদ্য উৎপাদন পুরো মানবজাতিকে একাধিকবার খাওয়ানোর মতো। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা খাদ্যঘাটতিতে নয়, সমস্যা বণ্টনে, সমস্যা রাষ্ট্রের ন্যায়হীনতায়।
এই বাস্তবতা আমাদের শেখায়—ক্ষুধা ব্যক্তিগত থাকলে তা কেবল যন্ত্রণাই সৃষ্টি করে, কিন্তু ক্ষুধা সমষ্টিগত চেতনায় উত্তীর্ণ হলে তা পরিবর্তনের শক্তি হয়ে ওঠে।
ক্ষুধার এই উত্তরণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—পরিবর্তন একার পক্ষে সম্ভব নয়। লাখো মানুষের সম্মিলিত হাতই পারে বিভাজনের প্রাচীর ভাঙতে। ক্ষুধা যখন হয়ে ওঠে যৌথ প্রতিরোধের ভাষা, তখনই ইতিহাস নতুনভাবে লেখা হয়।
অতএব, আমাদের সামনে একটিই পথ খোলা—বঞ্চনার পুঁথি পুড়িয়ে ফেলা, ন্যায়ের নতুন সেতুবন্ধন রচনা করা। তবেই ক্ষুধা আর যন্ত্রণা নয়; ক্ষুধা হয়ে উঠবে আশার প্রতীক, হয়ে উঠবে সমষ্টিগত নিরাপত্তা ও ন্যায়ের প্রতিশ্রুতি।
তথ্যসুত্রঃ
সুকান্ত ভট্টাচার্য, ছাড়পত্র, ১৯৪৭।
জ্যঁ-জাক রুশো, দ্য সোশ্যাল কনট্রাক্ট, ১৭৬২
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), The State of Food Security and Nutrition in the World, ২০২৪।
এরিক হবসবম, The Age of Revolution, ১৯৬২।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।