আড়ালের কথা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা। ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সেদিন আত্মীয়ের বাসা থেকে ফেরার সময় দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। মুখে হাসি, কুশল বিনিময়, পরিবারের সবার খোঁজখবর। যাওয়ার সময় বলেছিলেন, আবার যেন যাই।
আমিও হেসেছিলাম।
বাসায় ফিরে মনে হয়েছিল, অনেক দিন পর ভালো একটা সময় কাটল। আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো এমনই হওয়া উচিত। ব্যস্ততার কারণে দেখা হয় না, কথা হয় না, তবু দেখা হলে মনে হবে, মাঝখানে কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি।
দুদিন পর অন্য একজনের মুখে কিছু কথা শুনলাম।
আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে হাসাহাসি হয়েছে। এমন কিছু বিষয় নিয়েও কথা হয়েছে, যেগুলো আমি বিশ্বাস করে খুব অল্প কয়েকজনের সঙ্গে ভাগ করেছিলাম।
প্রথমে চুপ করে শুনছিলাম। তারপর একসময় আর শুনতে ইচ্ছে করল না।
কথাগুলো কতটা সত্য, কতটা বাড়িয়ে বলা, তা যাচাই করিনি। যিনি আমাকে বলেছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্যও জানি না। শুধু একটা দৃশ্য বারবার মনে পড়ছিল। সেই বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে বিদায় নেওয়া, মুখের হাসি, আবার যাওয়ার আমন্ত্রণ।
সেদিনের কোনো কথাই মিথ্যা ছিল, এমন প্রমাণ আমার কাছে নেই। কিন্তু শোনার পর থেকে সেই হাসিটাকে আর আগের মতো মনে হয়নি।
এরপর অনেক দিন কেটে গেছে। আত্মীয়টির সঙ্গে আবার দেখা হয়েছে। স্বাভাবিক কথাবার্তাও হয়েছে। তিনি হয়তো বুঝতেই পারেননি, আমার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে।
আমি কোনো প্রশ্ন করিনি। পুরোনো কথাগুলো তুলে ধরে তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলিনি। শুধু নিজের কিছু অভ্যাস বদলে ফেলেছি।
আগে ভালো কোনো খবর পেলে তাঁকে জানাতে ইচ্ছে করত। এখন আর করি না। কোনো সমস্যায় পড়লেও নিজের কথা নিজেই সামলে নেওয়ার চেষ্টা করি। পরিবারের ছোটখাটো ঘটনা, নিজের দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা, এসব আর আগের মতো ভাগ করে নিই না।
সম্পর্কটা আছে। শুধু কথার বিষয়গুলো কমে গেছে।
মাঝেমধ্যে কথা বলতে বলতে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘কী খবর? সব ঠিকঠাক?’
আমি বলি, ‘হ্যাঁ, ভালো আছি।’
উত্তরটা মিথ্যা নয়। আবার পুরো সত্যিও নয়।
আমার জীবনেও ভালো-মন্দ চলছে। কিছু কথা বলার আছে, কিছু কষ্ট আছে, কিছু আনন্দও আছে। আগে মনে হতো, আপনজনদের সঙ্গে এসব ভাগ করে নিলে সম্পর্কটা আরও কাছের হয়। এখন বুঝি, সব কথা সবার কাছে বলতে নেই। কথাগুলো যে একদিন অন্য কারও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, সেই আশঙ্কা একবার মনে ঢুকে গেলে আগের মতো সহজ হওয়া যায় না।
সবচেয়ে কষ্ট হয় অন্য জায়গায়।
যাঁদের সঙ্গে দেখা হলে এখনো হাসিমুখে কথা বলি, তাঁদের কাউকে কাউকে নিয়ে আমার মনেও প্রশ্ন আছে। তাঁদের সামনে বসে চা খাই, পরিবারের কথা বলি, প্রয়োজন হলে খোঁজও নিই। বাইরে থেকে কেউ বুঝবে না, আমি আগের মতো বিশ্বাস করতে পারি না।
কখনো ভাবি, সরাসরি জিজ্ঞেস করি। বলি, আমার সম্পর্কে কথাগুলো কি সত্যিই বলেছিলেন?
তারপর আর বলা হয় না।
কারণ উত্তর পেলেও হয়তো সবকিছু আগের জায়গায় ফিরবে না। তিনি অস্বীকার করতে পারেন, ব্যাখ্যা দিতে পারেন, কিংবা এমনভাবে বিষয়টা উড়িয়ে দিতে পারেন যেন আমার কষ্ট পাওয়ার কোনো কারণই নেই। আবার এমনও হতে পারে, আমি যা শুনেছি, তার অনেকটাই ভুলভাবে আমার কাছে পৌঁছেছে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাউকে অপরাধী বানাতে চাই না। কিন্তু নিজের অস্বস্তিটুকুও অস্বীকার করতে পারি না।
আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো তাই কখনো কখনো অদ্ভুত হয়ে যায়। মানুষ কাছেই থাকে, দেখা হয়, কথা হয়, উৎসবে একসঙ্গে বসা হয়। শুধু মনের দরজাটা আর পুরোপুরি খোলা হয় না।
একদিন পুরোনো কিছু ছবি দেখছিলাম। পারিবারিক অনুষ্ঠানের ছবি। সবাই একসঙ্গে বসে আছি, কারও হাতে চায়ের কাপ, কারও মুখে হাসি। ছবিগুলো দেখতে দেখতে মনে হলো, সেই সময়গুলো কি সত্যিই এত সহজ ছিল, নাকি তখনো অনেক কথা আড়ালে থাকত, শুধু আমার জানা ছিল না?
উত্তর পেলাম না।
ছবিগুলো বন্ধ করে দিলাম।
আমি জানি, আমার সম্পর্কেও মানুষের কথা হতে পারে। আমার কোনো আচরণ কারও অপছন্দ হতে পারে। আমার সিদ্ধান্ত ভুল মনে হতে পারে। এসব নিয়ে আমার আপত্তি নেই। আমি নিখুঁত কেউ নই, আর সবাই আমাকে ভালো ভাববে, এমন প্রত্যাশাও করি না।
শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়, যে কথাটা আমার সামনে বলা যায়, সেটা আমার অনুপস্থিতিতে বলার দরকার কী? আমার কোনো ভুল থাকলে আমাকে জানানো যায়। আমি কষ্ট দিয়ে থাকলে আমার সঙ্গে কথা বলা যায়। অন্তত এতটুকু সুযোগ তো পাওয়ার কথা।
কিন্তু সবাই হয়তো একইভাবে ভাবে না।
এখন আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফিরে এলে আগের মতো সব কথা মনে মনে সাজিয়ে রাখি না। কে কী বললেন, কতটা আন্তরিক ছিলেন, আবার কবে দেখা হবে, এসব নিয়ে ভাবি না। নিজের বাড়িতে ফিরে নিজের কাজ করি। চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে জানালার বাইরে তাকাই। দিন শেষ হয়ে যায়।
শুধু কখনো কখনো মনে পড়ে, সেদিন দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া মানুষটির মুখের হাসি।
আমি তাঁকে ঘৃণা করি না। সম্পর্কটাও ভেঙে ফেলিনি। হয়তো কোনো দিন আবার আগের মতো সহজ হতে পারব। হয়তো পারব না।
এখন আর সেটা জোর করে ঠিক করতে চাই না।
দোয়া করি, আত্মীয়স্বজনেরা আমাকে নিয়ে আড়ালে যে কথাগুলো বলে, সেগুলো যেন কোনো দিন আমার কানে না আসে।
কারণ কিছু কথা শোনার পর মানুষ সম্পর্ক ছেড়ে চলে যায় না। আগের মতোই ফিরে আসে, বসে, কথা বলে, হাসে। শুধু একসময় খেয়াল করে, নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে সে আর আগের মতো দরজাটা খুলতে পারছে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।