সুখ আর শান্তি এক নয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ৮ অক্টোবর ২০২৬
সুখ আর শান্তি সত্যিই কি একই জিনিস?
আমরা দুটো শব্দ খুব সহজেই একসঙ্গে ব্যবহার করি। কেউ নতুন বাড়ি কিনলে বলি, “এবার তো সুখে থাকবে।” কারও চাকরি ভালো হলে বলি, “জীবনটা সেট হয়ে গেছে।” সন্তান ভালো করছে, সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে, বিদেশে বেড়াতে যাচ্ছে—দেখে মনে হয়, মানুষটির জীবনে আর কী-ই বা চাই?
কিন্তু মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো সাধারণত বাইরে থেকে দেখা যায় না।
একজন মানুষ হয়তো সারাদিন ব্যস্ত। অফিসে কাজ আছে, মিটিং আছে, সহকর্মী আছে, ফোন আছে। মাস শেষে ভালো বেতন আসে। বাড়িতে ফিরলে ফ্রিজ ভর্তি খাবার, ঘরে প্রয়োজনীয় সবকিছু, সন্তানদের পড়াশোনার ভালো ব্যবস্থা।
তারপরও কোনো এক রাতে বিছানায় শুয়ে তার মনে হতে পারে, “আমি আসলে ভালো আছি তো?”
এই প্রশ্নের উত্তর টাকা দিয়ে দেওয়া যায় না।
কারণ সুখের একটা অংশ বাইরে থেকে আসে। শান্তির একটা অংশ ভেতর থেকে আসে।
টাকা থাকলে অনেক দুশ্চিন্তা কমে। ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়, সন্তানের পড়াশোনা নিশ্চিত করা যায়, নিজের প্রয়োজন মেটানো যায়। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অভাবের মধ্যে বসে শান্তির কথা বলা সহজ নয়।
কিন্তু অর্থের অভাব না থাকলেই যে অস্থিরতা থাকবে না, সেটাও সত্যি নয়।
একটা ঘরে দামি সোফা থাকতে পারে, বড় টেলিভিশন থাকতে পারে, সুন্দর ডাইনিং টেবিল থাকতে পারে। শুধু দুজন মানুষের মধ্যে কথা না-ও থাকতে পারে।
আবার খুব সাধারণ একটা ঘরে হয়তো পুরোনো সোফা, ছোট টেবিল, সীমিত আয়োজন। কিন্তু রাতের খাবার শেষে সবাই মিলে বসে গল্প করছে। দিনের কোনো একটা ঘটনা নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে। কেউ মন খারাপ করে থাকলে অন্যজন বুঝতে পারছে।
কোন ঘরটা বেশি সুখের?
এর উত্তর বাইরে থেকে দেওয়া কঠিন।
কারণ সুখের ছবি দেখা যায়। শান্তির ছবি দেখা যায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পার্থক্যটা আরও জটিল করে দিয়েছে। আমরা প্রতিদিন মানুষের জীবনের সাজানো অংশ দেখি। কারও বিদেশ ভ্রমণ, কারও নতুন গাড়ি, কারও নতুন বাড়ি, কারও বিবাহবার্ষিকীর ছবি, কারও সন্তানের সাফল্য।
ছবির নিচে লেখা থাকে, “আলহামদুলিল্লাহ”, “সুখের দিন”, “পরিবারই সব।”
আমরা ছবিটা দেখি। কিন্তু ছবির পরের রাতটা দেখি না।
সেই মানুষটা রাতে ঘুমাতে পেরেছে কি না, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা হয়েছে কি না, বাবার সঙ্গে ছেলের সম্পর্ক কেমন, মায়ের ভেতরে কোনো চাপ জমে আছে কি না—এসব কোনো ছবির অংশ নয়।
তাই অন্যের সাজানো মুহূর্তের সঙ্গে নিজের পুরো জীবনকে তুলনা করা খুব সহজেই মানুষকে অসুখী করে দিতে পারে।
আরেকটা বিষয় আছে। আমরা অনেক সময় সুখকে অর্জনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি।
চাকরি পেলাম, সুখ।
বেতন বাড়ল, সুখ।
গাড়ি কিনলাম, সুখ।
ফ্ল্যাট কিনলাম, সুখ।
বিদেশে গেলাম, সুখ।
এসবই সুখের অংশ হতে পারে। কিন্তু এগুলো সুখের পুরো সংজ্ঞা নয়।
কারণ একটা নতুন গাড়ি কিছুদিন পর পুরোনো মনে হয়। নতুন ফোন একসময় আর নতুন থাকে না। যে বাড়ি কিনে প্রথম দিন খুব আনন্দ হয়েছিল, কয়েক বছর পর সেটাই প্রতিদিনের ঘর হয়ে যায়।
মানুষ খুব দ্রুত নতুন পাওয়া জিনিসের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
কিন্তু একটা সম্পর্কের নিরাপত্তার সঙ্গে মানুষ যেভাবে অভ্যস্ত হয়, সেটা অন্যরকম।
রাতে বাড়ি ফিরলে কেউ দরজা খুলবে—এই নিশ্চয়তা।
অসুস্থ হলে কেউ ওষুধের কথা মনে করিয়ে দেবে—এই ভরসা।
মন খারাপ হলে পাশে বসে থাকবে—এই বিশ্বাস।
কখনো কিছু না বলেও বুঝে যাবে—এই সম্পর্ক।
এসবের বাজারদর নেই। কিন্তু জীবনের দরকারের সময় এগুলোর মূল্য বোঝা যায়।
তবে শান্তি মানে এমন নয় যে জীবনে কোনো সমস্যা থাকবে না।
বরং শান্ত মানুষও অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে যায়।
তারও টাকা নিয়ে চিন্তা হয়। সন্তান নিয়ে ভয় হয়। প্রিয় মানুষ অসুস্থ হলে সে দুশ্চিন্তা করে। কাছের মানুষের সঙ্গে তারও রাগ হয়। কখনো সে নিজেই ভুল করে বসে।
তাহলে শান্তি কোথায়?
সম্ভবত সমস্যার অনুপস্থিতিতে নয়, সমস্যার মধ্যেও একটা ভরসার জায়গা থাকার মধ্যে।
সংসারে ঝগড়া হলো। দুজনের কেউ একজন রাগ করে চুপ করে থাকল। কিছুক্ষণ পর অন্যজন হয়তো এসে বলল, “চলো, কথা বলি।”
এই একটা বাক্য অনেক বড় কিছু।
কারণ সম্পর্কের শান্তি মানে কখনো ঝগড়া না হওয়া নয়। বরং ঝগড়ার পরও সম্পর্কটা ধরে রাখার ইচ্ছা থাকা।
অভিমান থাকবে, কিন্তু সম্পর্ক ভেঙে ফেলার তাড়া থাকবে না।
রাগ থাকবে, কিন্তু অন্য মানুষটাকে শাস্তি দেওয়ার আনন্দ থাকবে না।
ভুল হবে, কিন্তু ভুল স্বীকার করার জায়গা থাকবে।
কষ্ট হবে, কিন্তু মনে হবে, “এই মানুষটার কাছেই তো আবার ফিরতে হবে।”
এই ফিরে যাওয়ার জায়গাটাই হয়তো শান্তি।
সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার জন্য সবসময় বড় কোনো বিশ্বাসঘাতকতা দরকার হয় না। অনেক সময় খুব সাধারণ কিছু অভ্যাসই দুজন মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়।
“এখন না।”
“পরে বলো।”
“অনেক কাজ আছে।”
“এসব নিয়ে আবার শুরু করো না।”
কথাগুলো শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু একই উত্তর বারবার পেতে পেতে একজন মানুষ একসময় আর প্রশ্ন করে না।
তারপর সংসারে আর ঝগড়া হয় না।
কথাও হয় না।
দুজন মানুষ একই ঘরে থাকে। একই খাবার খায়। একই বিছানায় ঘুমায়। তবু দিনের শেষে একজনের জীবনে অন্যজনের কোনো খবর থাকে না।
এটা বিচ্ছেদ নয়। আবার কাছাকাছি থাকাও নয়।
এটা এমন এক দূরত্ব, যার কোনো আলাদা ঠিকানা নেই।
আর এই জায়গাতেই সুখের সঙ্গে শান্তির পার্থক্যটা সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়।
একজন মানুষ হয়তো অনেক কিছু পেয়েছে, কিন্তু নিজের কথা বলার মতো কাউকে পায়নি।
অন্যদিকে আরেকজনের হয়তো খুব বেশি কিছু নেই। কিন্তু তার একটা মানুষ আছে, যার কাছে সে নিজের ক্লান্তি রেখে আসতে পারে।
কে বেশি সুখী?
হয়তো এই প্রশ্নেরও সরাসরি উত্তর নেই।
কারণ সুখের পরিমাণ মাপা যায় না। মানুষভেদে সুখের সংজ্ঞাও বদলে যায়।
কারও কাছে নিজের বাড়ি সুখ। কারও কাছে সন্তানের মুখ। কারও কাছে নিজের পছন্দের কাজ। কারও কাছে মাস শেষে ঋণের কিস্তি মিটিয়ে একটু নিশ্চিন্ত হওয়া।
এসবই সত্যিকারের সুখ।
কিন্তু শান্তি সম্ভবত আরও গভীর একটা ব্যাপার।
শান্তি হলো, সবকিছু ঠিকঠাক না থাকলেও ভেতরটা পুরোপুরি ভেঙে না পড়া।
শান্তি হলো, নিজের দুর্বলতাকে লুকিয়ে রাখতে না হওয়া।
শান্তি হলো, কারও সামনে কাঁদলে নিজেকে ছোট মনে না হওয়া।
শান্তি হলো, ঘরে ফিরে অভিনয় করতে না হওয়া।
আর কখনো কখনো শান্তি মানে শুধু একজন মানুষের পাশে বসে থাকা। কোনো কথা নেই, কোনো সমাধান নেই, তবু মনে হচ্ছে—আমি একা নই।
এই কারণেই জীবনে শুধু সুখ খোঁজা যথেষ্ট নয়।
আমরা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাই। বাড়ি করার জন্য সঞ্চয় করি। ভালো জীবনের জন্য সারাদিন পরিশ্রম করি। এসব দরকার।
কিন্তু যে জীবনের জন্য এত পরিশ্রম করছি, সেই জীবনটার ভেতরে মানুষ রাখছি তো?
স্বামী-স্ত্রী শেষ কবে একসঙ্গে বসে কোনো প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেছে?
বাবা শেষ কবে ছেলের কথা শুধু শুনেছে, উপদেশ দেওয়ার জন্য নয়?
মা শেষ কবে মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছে, “তুই সত্যি ভালো আছিস তো?”
বন্ধুর সঙ্গে শেষ কবে কথা হয়েছে, যেখানে কারও কোনো প্রয়োজন ছিল না?
জীবন অনেক সময় বড় কোনো ঘটনায় বদলায় না। বদলায় এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো হারিয়ে গেলে।
একদিন দেখা যায়, ঘরে সব আছে। শুধু আগের মতো কেউ নেই।
তখন মানুষ বুঝতে পারে, স্বাচ্ছন্দ্য আর শান্তি এক জিনিস নয়।
সুখ হয়তো জীবনের কিছু সুন্দর মুহূর্ত, কিছু পাওয়া, কিছু আনন্দের নাম।
আর শান্তি?
শান্তি হয়তো সেই জায়গা, যেখানে দিনের শেষে ফিরে এসে মানুষ নিজের ভেতরটাকে আর লুকিয়ে রাখতে চায় না।
হয়তো সুখের প্রশ্নটা তাই শুধু “আমার কী আছে?” নয়।
তার সঙ্গে আরও একটা প্রশ্ন থাকা দরকার—
“যা কিছু আছে, তার মধ্যে আমি কি সত্যিই শান্তিতে আছি?”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।