নিজেকে সম্মান করুন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | জানুয়ারি ৩০, ২০২৬
মাঝে মাঝে জীবনে এমন মুহূর্ত আসে যখন মনে হয়, আপনাকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। আপনার কথা যেন কেউ শুনছেই না, আপনার উপস্থিতিতে কারোর মধ্যে কোনো তোড়জোড় নেই।
আমারও হয়েছে। কয়েক বছর আগে, একটি অফিস মিটিংয়ে আমি একটি আইডিয়া দিয়েছিলাম। কিন্তু ইতস্তত করে, মাঝেমধ্যে “আম্ম…” বলে থেমে গিয়ে কথা শেষ করতে পারিনি। সবাই চুপ করে শুনল, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দিল না। পরে একজন কলিগ বলল,
“ভাই, তোমার কথা ঠিকই ছিল, কিন্তু বলার ধরনটা এমন ছিল যেন তুমি নিজেই বিশ্বাস করো না।”
সেদিন একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। সমস্যাটা তখন আর মিটিংরুমে সীমাবদ্ধ ছিল না।
আপনি যদি নিজের কথার ওপর ভরসা না রাখেন, অন্যরা সেটা ঠিকই টের পায়।
এই লেখায় কোনো বড় তত্ত্ব নেই। আছে কিছু সাধারণ অভিজ্ঞতা, যেগুলো আমাকে নিজের প্রতি একটু বেশি মনোযোগী হতে শিখিয়েছে।
কথা বলার ধরন অনেক সময় আমাদের নিজের কাছেই অজানা একটা পরিচয় বহন করে। আমরা কীভাবে কথা বলি, কোথায় থামি, কোথায় হেসে ফেলি—এসবই অন্যদের কাছে একটা ধারণা তৈরি করে।
কথা বলার সময় অতিরিক্ত ইতস্তত করা, বাক্যের মাঝে বারবার “দুঃখিত” বা “sorry” বলা, কিংবা “আম্ম”, “উহু” দিয়ে কথার গতি ভেঙে ফেলা—এই অভ্যাসগুলো অনেক সময় অজান্তেই নিজের কথাকেই দুর্বল করে দেয়।
এখানে জোর মানে গলার আওয়াজ না। জোর মানে স্পষ্ট থাকা।
একটা ছোট পরিবর্তন আমার ক্ষেত্রে বেশ কাজে দিয়েছিল—ধীরে কথা বলা।
ধীরস্থিরভাবে কথা বললে, ভাবনার জায়গাগুলোও পরিষ্কার হয়।
কথার মাঝে চুপ থাকা যে ভুল, এমন কোনো নিয়ম নেই। নীরবতার মধ্যেও অনেক সময় কথা থাকে। সেই নীরবতাকে “আম্ম” বা “সরি” দিয়ে ভরাট করার দরকার হয় না।
ঢাকার একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে একবার কেউ জিজ্ঞেস করেছিল,
“জাহিদ ভাই, তুমি তো অনেক ব্যস্ত, এখানে থাকতে পারবে?”
আগে হলে হয়তো বলতাম, “আম্ম… দেখি…”
সেদিন সরাসরি বলেছিলাম, “না, আমি থাকব না। আমার একটি জরুরি কাজ আছে।”
কথাটা বলার পর একটু থেমেছিলাম। চারপাশে অদ্ভুত একটা নীরবতা ছিল। পরে কয়েকজন এসে বলেছিল,
“ভাই, তোমার কথাটা পরিষ্কার ছিল।”
সেদিন বুঝেছিলাম—নীরবতা সব সময় অস্বস্তিকর না।
নিজের যত্ন নেওয়ার কথা শুনতে অনেক সময় খুব পরিচিত লাগে। এতটাই পরিচিত যে আমরা সেটাকে গুরুত্ব দিই না।
কিন্তু সত্যি করে বললে, কবে শেষবার আপনি নিজেকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন?
সময়মতো খাওয়া, ঘুমের একটা রুটিন রাখা, রাত জেগে অকারণে স্ক্রল না করা—এগুলো ছোট মনে হলেও প্রভাব ফেলে।
আমাদের সংস্কৃতিতে অন্যের জন্য ব্যস্ত থাকা একটা গুণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নিজের প্রয়োজন একেবারে উপেক্ষা করলে, সেটার মূল্যও দিতে হয়।
নিজেকে এমনভাবে গুছিয়ে রাখা দরকার, যাতে নিজের কাছেই আপনি অবহেলিত না হন।
সবাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করতে করতে অনেক সময় নিজের ক্লান্তিটাই চোখে পড়ে না।
এখানে একটা ছোট শব্দ কাজে আসে—“না”।
“না, আমি পারব না।”
এটার পরে সব সময় ব্যাখ্যা দরকার হয় না।
একবার ঈদের সময় আত্মীয়ের চাপে কোথাও যেতে রাজি হয়েছিলাম, যদিও শরীর আর মন দুটোই ক্লান্ত ছিল। ফলাফলটা খুব সুখকর হয়নি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছিলাম, নিজের সীমা না জানলে অন্যরাও সেটা জানবে না।
অনেক সময় মনে মনে “না” বলতে চেয়েও আমরা “হ্যাঁ” বলে ফেলি।
সেখান থেকেই ধীরে ধীরে অস্বস্তি জমে।
নিজের সময়, শক্তি আর সম্পর্কগুলোর চারপাশে একটা সুস্থ সীমা থাকা দরকার। কে কখন কতটা জায়গা পাবে, সেই সিদ্ধান্তটা নিজের হওয়াই স্বাভাবিক।
মানুষ সাধারণত সেভাবেই ব্যবহার করে, যেভাবে আমরা তাদের ব্যবহার করতে শেখাই।
বিশ্বাস খুব ছোট জায়গা থেকে তৈরি হয়।
কথা দিয়ে কথা রাখা, প্রতিশ্রুতি ছোট হলেও তা মানা।
বলেছেন কল ব্যাক করবেন? করলে ভালো।
ভুল হলে স্বীকার করাও এক ধরনের দৃঢ়তা।
অজুহাত দিয়ে পরিস্থিতি সামলানো যায়, কিন্তু বিশ্বাস ধরে রাখা যায় না।
চিৎকার করে কথা বলার দরকার নেই। অনেক সময় শান্ত থাকাটাই বেশি দৃঢ় মনে হয়। সোজা হয়ে দাঁড়ানো, চোখে চোখ রেখে কথা বলা—এই ছোট বিষয়গুলোও প্রভাব ফেলে।
আত্মবিশ্বাস সব সময় প্রকাশ্যে আসে না। অনেক সময় সেটা খুব শান্তভাবে উপস্থিত থাকে।
শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা খুব জটিল কিছু না।
নিজের ভেতরের শক্তিটাকে চিনে নেওয়া।
আমি যখন নিজের সাথে এই জায়গাগুলোতে একটু সৎ হতে শুরু করলাম, তখন জীবনটা ধীরে ধীরে হালকা লাগতে শুরু করল।
আপনার ক্ষেত্রেও হয়তো ঠিক সেখান থেকেই শুরু হবে।
#SelfRespect #Confidence #Boundaries
#আত্মবিশ্বাস #সম্মান
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।