স্ত্রীকে কেন ভালো লাগে না?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৭ জুলাই, ২০২৬
"আগের মতো আর ওকে ভালো লাগে না।"
কথাটা অনেক পুরুষই কোনো না কোনো সময় মনে মনে বলেছেন। কেউ হয়তো বন্ধুর কাছে বলেছেন, কেউ বলেননি। কিন্তু আচরণে সেটা ধরা পড়ে যায়। আগে যে মানুষটা অফিস থেকে ফিরে স্ত্রীর সাথে গল্প করতেন, এখন তিনি ফোনে ব্যস্ত। আগে ছুটির দিন মানেই দুজনের একসাথে সময় কাটানো। এখন একই বাড়িতে থেকেও দুজন যেন আলাদা পৃথিবীতে বাস করেন।
তখন প্রশ্নটা মাথায় আসে—সত্যিই কি স্ত্রীকে আর ভালো লাগে না? নাকি ভালো লাগার জায়গাটা ধীরে ধীরে শুকিয়ে গেছে?
অনেকেই খুব সহজে বলেন, "বিয়ের পর মেয়েরা বদলে যায়।" আগের মতো সাজে না, আগের মতো হাসে না, আগের মতো যত্ন নেয় না। কথাগুলো কিছু ক্ষেত্রে সত্যিও হতে পারে।
কিন্তু একটা প্রশ্ন খুব কম মানুষই নিজেকে করেন—
আমি কি আগের মতো আছি?
যে মানুষটা একসময় দিনে কয়েকবার ফোন করতেন, তিনি কি এখনও করেন? যে মানুষটা কোনো কারণ ছাড়াই একটা ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরতেন, তিনি কি এখনও ছোট ছোট আনন্দ তৈরি করার চেষ্টা করেন?
সম্পর্কের সমস্যা হলো, এটা একদিনে ভাঙে না। একটু একটু করে ভাঙে।
প্রথমে কথা কমে যায়। তারপর প্রশংসা কমে যায়। এরপর দুজনই ব্যস্ত হয়ে পড়েন নিজের নিজের জগতে। একসময় সংসার থাকে, দায়িত্ব থাকে, কিন্তু সম্পর্কটা আর আগের জায়গায় থাকে না।
আমরা একটা বড় ভুল করি। যে মানুষটা প্রতিদিন পাশে থাকে, তাকে খুব সহজেই ধরে নিই। মনে হয়, সে তো আছেই। তাই তার ভালো কাজগুলো চোখে পড়ে না। কিন্তু একটা ছোট ভুলই বড় হয়ে দেখা দেয়।
এভাবেই ভালো লাগার জায়গায় বিরক্তি জমতে শুরু করে।
এখন আরেকটা বিষয়ও কাজ করছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
প্রতিদিন অন্যের সাজানো সুখ দেখি। কারও ঘুরতে যাওয়া, কারও হাসিমুখ, কারও রোমান্টিক ছবি। ধীরে ধীরে মনে হয়, শুধু নিজের জীবনটাই যেন ফিকে।
কিন্তু আমরা ভুলে যাই, মানুষ ছবি পোস্ট করে, সমস্যা না। হাসি দেখায়, কান্না না। তাই অন্যের জীবন দেখে নিজের সম্পর্ককে বিচার করা কখনোই ন্যায্য না।
আবার এটাও সত্যি, সব দোষ শুধু পুরুষের না।
অনেক স্ত্রীও আছেন, যারা সবসময় অভিযোগ করেন, স্বামীর প্রতি সম্মান দেখান না, তার মানসিক চাপ বোঝার চেষ্টা করেন না। সম্পর্কে যদি একজন শুধু সমালোচনা করেন আর অন্যজন শুধু চুপ করে থাকেন, তাহলে দূরত্ব তৈরি হবেই।
সংসার একা কেউ গড়ে না। আবার একা কেউ ভাঙেও না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুজনের ছোট ছোট ভুলই একদিন বড় সমস্যায় পরিণত হয়।
কী করলে আবার ভালো লাগবে?
সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে বড় কোনো জাদু লাগে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্নই যথেষ্ট।
১. ফোনটা ১০ মিনিট দূরে রাখুন
বাসায় ফিরে অন্তত প্রথম ১০ মিনিট স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। জিজ্ঞেস করুন, “আজ দিনটা কেমন গেল?” শোনার জন্য শুনুন, উত্তর দেওয়ার জন্য না।
২. ধন্যবাদ বলার অভ্যাস করুন
ভাতটা গরম, জামাটা ইস্ত্রি করা, বাচ্চার পড়া দেখা—এগুলো তার দায়িত্ব ভাবা বন্ধ করুন। ছোট কাজের জন্যও বলুন, “থ্যাংক ইউ”। কৃতজ্ঞতা সম্পর্ক বাঁচায়।
৩. কারণ ছাড়া প্রশংসা করুন
“তোমাকে আজ ভালো লাগছে” বলতে উপলক্ষ লাগে না। যে মানুষটা আপনার জন্য সাজে, সে একটা কথা শুনতে চায়। সপ্তাহে একবার হলেও বলুন।
৪. তুলনা বন্ধ করুন
অন্যের স্ত্রী কী রান্না করল, কোথায় ঘুরতে গেল—দেখা বন্ধ করুন। আপনার ঘরের মানুষটার যে গুণটা শুধু আপনার জন্য, সেটা খুঁজে বের করুন।
৫. ছোট সারপ্রাইজ ফিরিয়ে আনুন
বেলি ফুল, তার পছন্দের চকলেট, বা ফেরার পথে একটা সিঙ্গারা। দাম না, ইচ্ছেটাই আসল। মনে করিয়ে দিন, আপনি এখনও তাকে ভাবেন।
৬. রাগের মধ্যেও সম্মান রাখুন
ঝগড়া হবে। কিন্তু গালি না, খোঁটা না, পরিবার টেনে কথা না। রাগ মিটে যাবে, কিন্তু অসম্মানের দাগ থেকে যায়।
৭. ‘আমরা’ শব্দটা ফিরিয়ে আনুন
“আমার অফিস”, “তোমার সংসার” না বলে বলুন “আমাদের সমস্যা”, “আমাদের প্ল্যান”। দায়িত্ব ভাগ করে নিন। একসাথে বাজার, একসাথে সিদ্ধান্ত—এতেই দূরত্ব কমে।
ভালোবাসা শুধু বিয়ের শুরুর দিনের উত্তেজনা না। ভালোবাসা মানে প্রতিদিন একই মানুষটাকে নতুন করে সম্মান করা, তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা, রাগের মধ্যেও সম্পর্কটাকে গুরুত্ব দেওয়া।
হয়তো আপনার স্ত্রী আগের মতো নেই।
কিন্তু আপনিও কি আগের মতো আছেন?
এই প্রশ্নটার উত্তর যতটা সৎভাবে দিতে পারবেন, ততটাই পরিষ্কার হবে সমস্যার আসল কারণ।
অনেক সম্পর্ক ভাঙে না ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে। ভাঙে, কারণ দুজন মানুষই একসময় সম্পর্কের যত্ন নেওয়া বন্ধ করে দেন। তখন একই ছাদের নিচে থেকেও তারা একে অপরের কাছে অপরিচিত হয়ে যান।
তাই স্ত্রীকে আর ভালো লাগে না বলার আগে একবার সম্পর্কটার দিকে তাকান। হয়তো মানুষটা বদলায়নি। বদলে গেছে আপনাদের একে অপরকে দেখার অভ্যাস।
আপনার কী মনে হয়?
একজন মানুষ কেন নিজের স্ত্রীকে আর ভালো লাগে না?
সময়ের কারণে, অবহেলার কারণে, নাকি দুজনেই অজান্তে সম্পর্কটাকে যত্ন করা বন্ধ করে দেন?
আপনার মতামত কমেন্টে লিখুন। আলোচনা হোক, দোষারোপ না।
#সম্পর্ক #দাম্পত্যজীবন #ভালোবাসা #সংসার #জীবনকথা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।