আচারে পবিত্র, বিবেকে কতটা?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৩ নভেম্বর ২০২৬
সেদিন মাংসের দোকানে লোকটির সঙ্গে দেখা। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তিনি মাংস দেখছিলেন। কোনটা তাজা, কোনটায় চর্বি বেশি, কোনটা নিলে বাড়ির সবাই খেতে পারবে, এসব নিয়ে তাঁর বেশ হিসাব। দোকানদারকে কয়েকবার মাংস উল্টেপাল্টে দেখাতে বললেন। একপর্যায়ে দাম নিয়েও বেশ দরদাম হলো। শেষে পছন্দমতো মাংস কিনে ব্যাগে ভরে নিলেন।
দোকান থেকে বেরিয়ে পাশের ফুলের দোকানে দাঁড়ালেন। কয়েকটা ফুল কিনলেন। ফুলওয়ালাকে দাম দেওয়ার সময় তাঁর কণ্ঠে বেশ নম্রতা। তারপর ধীর পায়ে মন্দিরের দিকে চলে গেলেন।
দৃশ্যটা দেখে আমার মনে একটা প্রশ্ন এল। একই মানুষ কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কত ভিন্ন আচরণ করতে পারেন! মাংস কেনার সময় তাঁর চোখে ছিল হিসাব, দরদাম আর পছন্দের কঠোরতা। ফুল কেনার সময় সেই মানুষটিই বেশ বিনয়ী।
অবশ্য এতে আপত্তির কিছু নেই। দরদাম করা অন্যায় নয়, ফুল কেনাও অন্যায় নয়। ধর্মীয় উপাসনায় যাওয়া মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু আমার ভাবনাটা আটকে গেল অন্য জায়গায়। উপাসনালয়ে প্রবেশের আগে যে বিনয় তাঁর আচরণে দেখা গেল, সেই বিনয় কি দোকানের ভেতরেও থাকা সম্ভব ছিল না? মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে, অন্য প্রাণীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে, নিজের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে সেই বিশ্বাসের কোনো ছাপ কি থাকা উচিত নয়?
আমরা ধর্মকে অনেক সময় কিছু নির্দিষ্ট আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। কখন গোসল করতে হবে, কীভাবে উপাসনা করতে হবে, কোন খাবার গ্রহণ করা যাবে, কোনটি যাবে না, এসব নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সচেতনতা আছে। ধর্মীয় বিধান মেনে চলার নিজস্ব গুরুত্বও রয়েছে। কিন্তু সেই বিধান পালনের পাশাপাশি মানুষের বিবেক কতটা সক্রিয় থাকছে, সেটি নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।
লোকটি যে মাংস কিনলেন, সেটি কোনো গাছ থেকে আসেনি। তার পেছনে একটি প্রাণীর জীবন ছিল। খাদ্যাভ্যাস মানুষের ব্যক্তিগত, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। মাংস খাওয়া বা না খাওয়া নিয়ে সবার মত এক হবে না। কিন্তু প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা, অপ্রয়োজনীয় কষ্ট কিংবা জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীনতাকে কি আমরা সহজেই উপেক্ষা করতে পারি?
আমরা খাবারের সতেজতা নিয়ে ভাবি, পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ভাবি, দাম নিয়ে ভাবি। কিন্তু খাবারের পেছনের জীবন নিয়ে ভাবার অভ্যাস কতটা আছে? একটি প্রাণীকে জবাই করার সময় আমাদের মনে কোনো প্রশ্ন আসে কি? নাকি বাজারের ব্যাগে মাংস ওঠার পর তার আগের অস্তিত্বটুকুও আমাদের চিন্তা থেকে মুছে যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর সবার কাছে এক হবে না। কিন্তু প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।
ধর্মীয় পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও আমাদের ভাবনার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। কোনো মৃত মানুষের দেহ স্পর্শ করার পর কেউ ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী স্নান করেন, শুচিতার নিয়ম পালন করেন। অথচ সেই মানুষটি জীবিত থাকাকালে তাঁর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছি, সেটি নিয়ে কি একই রকম সতর্কতা থাকে? বাহ্যিক শুচিতা নিয়ে আমাদের যতটা মাথাব্যথা, মনের ভেতরের হিংসা, অহংকার, বিদ্বেষ আর অন্যায় নিয়ে কি ততটা চিন্তা করি?
মন্দিরে ফুল দেওয়ার সময় হাত জোড় করা সহজ। মসজিদে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করাও সহজ। কিন্তু উপাসনালয় থেকে বেরিয়ে নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো কতটা সহজ? যে মানুষটি আমাদের চেয়ে দুর্বল, তার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা কতটা সহজ? নিজের ভুল স্বীকার করে অন্যের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সময় আমাদের বিনয় কোথায় থাকে?
আমার মনে হয়, এখানেই ধর্মীয় আচরণ আর ব্যক্তিগত বিবেকের মধ্যে সবচেয়ে বড় দূরত্ব তৈরি হয়। আমরা বিশ্বাসের পরিচয় বহন করি, কিন্তু সেই বিশ্বাসের দায়িত্ব সব সময় বহন করি না।
লোকটির দিকে আবার তাকালাম। তিনি তখন ফুল হাতে উপাসনালয়ের ভেতরে ঢুকে গেছেন। হয়তো তিনি আন্তরিকভাবেই প্রার্থনা করছেন। তাঁর বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অধিকার আমার নেই। কিন্তু তাঁর মতো আমরাও কি কখনো নিজেদের আচরণ নিয়ে ভাবি? ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে নিজের অসংগতিগুলোকে কি খুব সহজে মেনে নিই?
হয়তো লোকটি দোকানদারের সঙ্গে কোনো অন্যায় করেননি। হয়তো প্রাণীর প্রতি তাঁর নিজের বিশ্বাস ও উপলব্ধি আছে। আমি তাঁর মনের খবর জানি না। কিন্তু দৃশ্যটি আমাকে নিজের দিকেই তাকাতে বাধ্য করেছিল।
আমিও তো প্রতিদিন নানা বিষয়ে হিসাব করি। কোথায় কত টাকা বাঁচবে, কে আমাকে সম্মান দিল, কে দিল না, কার আচরণে আমি কষ্ট পেলাম। নিজের সুবিধার সময় অনেক কিছুই মেনে নিই, আবার অন্যের সামান্য ভুলে বিরক্ত হয়ে উঠি। মুখে নীতি ও বিশ্বাসের কথা বললেও প্রতিটি কাজে সেই নীতির প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছি কি না, তার হিসাব কখনো ঠিকমতো করি না।
সেদিন ফুল হাতে উপাসনালয়ে ঢুকে যাওয়া লোকটিকে দেখে তাই শুধু তাঁর আচরণ নিয়ে ভাবিনি। নিজের ভেতরেও একই রকম কোনো বিভাজন আছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছিল।
দোকান থেকে কেনা মাংসের ব্যাগ আর ফুলের তোড়া হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল। ফুল দিয়ে প্রার্থনা শেষ হয়েছে, মাংস রান্না হয়ে খাবার টেবিলে উঠেছে। দিনের ঘটনাটিও হয়তো তাঁর মনে আর নেই।
কিন্তু আমার মনে একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে। আমরা যে পবিত্রতার খোঁজে উপাসনালয়ে যাই, সেই পবিত্রতার সামান্য অংশও কি সঙ্গে করে ফিরিয়ে আনতে পারি?
এই প্রশ্নের বাইরে আমিও নই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।