গল্প লিখতে গিয়ে যা হারিয়ে ফেলি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৩ মার্চ ২০২৬
গল্পটা লেখা শেষ হলো ২০১৯-এর একটি বৃষ্টির রাতে। সবাই পড়ে বলল—ভালো হয়েছে। কিন্তু আমি জানি, সেই পাতায় আমি এক বন্ধুকে মেরে ফেলেছি। রিফাত। আমরা আর কথা বলি না ২০২১ থেকে।
অপরাধ? না, আইনি কিছু নয়। কিন্তু সেই চরিত্রের কথা, হাঁটা, হাসি—সব তো রিফাতের। আমি তাকে কাগজে নামিয়ে এনে, গল্পের প্রয়োজনে একটা দুর্ঘটনায় শেষ করে দিলাম। পাঠকেরা কাঁদলো। আমিও কেঁদেছিলাম—তিন রাত ঘুমোতে পারিনি। তবু মনে হলো—অপরাধ করেছি। যেন সত্যিই কাউকে শেষ করে দিয়েছি।
চরিত্র তৈরি করতে গেলে মনের কোণ থেকে কিছু একটা বের করে আনতে হয়। ভয়, লোভ, ভালোবাসা—সব মিশিয়ে একটা মানুষ দাঁড় করাও। তারপর সেই চরিত্র মরে গেলে মনে হয় নিজের কিছু একটাও মরে গেল।
এক পরিচিত লেখকের কথা মনে পড়ে। তিনি লিখেছিলেন মায়ের মৃত্যু নিয়ে—যদিও তাঁর মা তখনো বেঁচে ছিলেন। বই শেষে তিনি বলেছিলেন, "মনে হলো মাকে সত্যিই হারিয়ে ফেললাম। গল্পে মা মরলো বলে মনে হলো ছাড়া হয়ে গেলাম।"
কল্পনার একটা মনস্তাত্ত্বিক দাম আছে—যা লেখো, তা তোমাকে বদলে দেয়। কখন তুমি আর কখন চরিত্র—এই সীমানা ধোঁয়াশায় মিশে যায়।
জীবন্ত চরিত্র করতে হলে তার ভেতরে ঢুকতে হয়। তার ব্যাথা তোমার ব্যাথা হয়। কখনো কখনো লেখা শেষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মন খারাপ থাকে—চরিত্রের সাথে যা করেছো, তা মনে লেগে থাকে।
আমি একবার একাকীত্ব নিয়ে লিখেছিলাম। চরিত্রটা একা থাকতো, কারো সাথে কথা বলতো না। লেখার এক সপ্তাহ পর নিজেই লক্ষ্য করলাম—বন্ধুদের ফোন ধরছি না, বাইরে যাচ্ছি না। চরিত্রের একাকীত্বে এতটাই ডুবেছিলাম যে নিজের জীবন ভুলে গেছিলাম।
স্বাভাবিক কি? সম্ভবত নয়। কিন্তু সত্যি। লেখকরা নিজেদের ছড়িয়ে দেন চরিত্রে। সেই অংশগুলো আর ফেরত পাওয়া যায় না।
আত্মজীবনীমূলক কল্পনার একটা বিপজ্জনক আকর্ষণ আছে। জীবনের মানুষজনকে নিয়ে লেখো—নাম বদলাও, চেহারা বদলাও। কিন্তু তুমি জানো কে কে। কখনো কখনো নিজেও জানো না কোথায় সত্যি, কোথায় কল্পনা।
সুমন ছিল আমার স্কুলের বন্ধু। এখন আর যোগাযোগ নেই। কিন্তু সে আমার এক গল্পে আছে—ঠিক তার মতো কথা বলে, হাসে। গল্পে সে খারাপ হয়নি। তবু আমি জানি, তাকে ব্যবহার করেছি। তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে নিয়েছি কাজের জন্য। এটা কি চুরি? নাকি শ্রদ্ধা?
উত্তর জানি না। তবে জানি—কেউ বলে "চরিত্রটা খুব বাস্তব লাগলো"—তখন একটা শিহরণ কাজ করে। কারণ হ্যাঁ, বাস্তব ছিল। খুবই বাস্তব।
লেখো, আশা করো পাঠক বুঝবে। কিন্তু তারা বোঝে নিজেদের মতো করে। কেউ বলে ভালো, কেউ বলে হতাশাজনক। কেউ চরিত্রকে নিজের মতো ভাবে—তোমার ভাবনার সাথে নাও মিলতে পারে।
কষ্ট দেয়? মাঝে মাঝে। যে চরিত্র নিয়ে রাত কেটেছে, কেউ বলে দেয় "বাড়াবাড়ি লাগলো।" চুপ থাকো। কারণ জানো—সেটা বাড়াবাড়ি ছিল না। সেটা ছিল তোমার সত্যি কান্না, কাগজে নামানো।
আবার কেউ বলে "আমার সাথে মিলে গেলো।" সেই মুহূর্তে মনে হয় কষ্ট সার্থক। ব্যাথা ভাগ করে দিয়েছো, কেউ নিজের বলে নিয়েছে।
গল্প লেখা মানে নিজেকে কাটাকাটি। মনের টুকরো ছড়িয়ে দেওয়া কাগজে। কিছু টুকরো ফেরত পাওয়া যায় না। তবু লেখো—কারণ লেখা ছাড়া বাঁচা যায় না মনে হয়।
আমি রিফাতকে গল্পে মেরেছিলাম। কিন্তু সে আমার মনে বেঁচে আছে। প্রতিবার কেউ পড়ে, সে জেগে ওঠে। হয়তো এভাবেই লেখকরা অমরত্ব দেন চরিত্রদের—নিজের কিছু হারিয়ে।
তুমি কি কখনো জীবনের কাউকে কল্পনায় রেখেছো? জানাও—সেই চরিত্র কে ছিল?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।