চিন্তার চিতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৮ অক্টোবর ২০২৬
রাত তিনটায় কামাল ঘুম থেকে উঠে বসে। ঘরের সবাই ঘুমাচ্ছে, শুধু তার চোখে ঘুম নেই। আগামী মাসে ছেলের স্কুলের বেতন দিতে হবে, অফিসে বেতন বাড়ার কথা থাকলেও কিছু নিশ্চিত নয়, মায়ের ওষুধও প্রায় শেষ। বিছানায় শুয়ে সে একটার পর একটা হিসাব মেলায়। কোনো হিসাবই মেলে না।
কিছুক্ষণ পর তার মনে পড়ে, বিকেলে এক আত্মীয় ফোন করে এমন একটা কথা বলেছিলেন, যা তার ভালো লাগেনি। কথাটির উত্তর তখন দিতে পারেনি। এখন মনে মনে সে নানা উত্তর সাজায়। ভাবে, মানুষ তাকে ছোট করে দেখে। ভাবে, এত পরিশ্রম করেও সে জীবনে কিছু করতে পারল না।
পাশে তার স্ত্রী ঘুমাচ্ছে। ছেলেটাও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। অথচ এই দুজনের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতেই কামাল নিজের বর্তমানটুকু হারিয়ে ফেলছে।
একসময় তার মনে হয়, আজকের রাতটাও বুঝি শেষ হবে না।
যে আগুন দেখা যায় না
একদিন চিন্তা চিতাকে বলল, ‘তুমি মৃতকে পোড়াও, আর আমি জীবিতকে পোড়াই।’
কথাটি কল্পনার, কিন্তু এর ভেতরে মানুষের জীবনের পরিচিত এক সত্য লুকিয়ে আছে। চিতার আগুন চোখে দেখা যায়। তার উত্তাপ অনুভব করা যায়। মানুষ জানে, আগুন জ্বলছে এবং একসময় নিভেও যাবে। কিন্তু দুশ্চিন্তার আগুনের কোনো দৃশ্যমান শিখা নেই। বাইরে থেকে একজন মানুষকে স্বাভাবিক দেখালেও তার ভেতরে কতটা অস্থিরতা জমে আছে, তা বোঝা যায় না।
কামাল প্রতিদিন অফিসে যায়, কাজ করে, বাজার করে, ছেলের পড়াশোনার খোঁজ নেয়। বাইরে থেকে তার জীবনে বিশেষ কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। অথচ সামান্য একটি ঘটনা তার মাথায় ঢুকে গেলে সেটি আর সহজে বের হয় না। গতকালের অপমান আগামীকালের আশঙ্কার সঙ্গে মিশে যায়। আজকের আর্থিক সংকট তাকে এমন এক ভবিষ্যতের ছবি দেখায়, যা হয়তো কখনো ঘটবেই না।
ঘটনা যতটা কষ্ট দেয়, তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া আশঙ্কা কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়।
সমস্যার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে দুশ্চিন্তা
কামালের আর্থিক সংকট বাস্তব। ছেলের স্কুলের বেতন দিতে হবে, মায়ের ওষুধ কিনতে হবে। এসব নিয়ে চিন্তা করার কারণ আছে। কিন্তু রাতভর একই হিসাব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করলেই কি টাকা বেড়ে যায়? আত্মীয়ের কথার জবাব মনে মনে শতবার দিলেই কি পুরোনো অপমান মুছে যায়?
বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজা আর একই সমস্যার মধ্যে মানসিকভাবে আটকে থাকা এক বিষয় নয়।
দুশ্চিন্তা অনেক সময় মানুষকে বোঝায়, সে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ প্রস্তুতি আর আশঙ্কার পুনরাবৃত্তির মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রস্তুতি মানুষকে কোনো পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে। আর অন্তহীন দুশ্চিন্তা একই জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখে।
কামাল যদি মাসের খরচ লিখে দেখে কোথায় কমানো যায়, ছেলের স্কুলের সঙ্গে কথা বলে কিস্তিতে বেতন দেওয়ার সুযোগ খোঁজে, কিংবা অন্য আয়ের পথ নিয়ে ভাবতে বসে, তাহলে তার চিন্তা একটি কাজের রূপ পায়। কিন্তু সে যদি প্রতিরাতে শুধু সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ছবি আঁকে, তাহলে তার ঘুম, মনোযোগ ও কাজের শক্তি কমতে থাকে। পরদিন ক্লান্ত শরীরে কাজে গিয়ে ভুল করার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
এভাবে যে সমস্যা সমাধানের জন্য চিন্তা শুরু হয়েছিল, অতিরিক্ত চিন্তাই কখনো নতুন সমস্যা তৈরি করে।
নিজের মন থেকে একটু দূরে
কামাল এক সকালে ছেলের স্কুলের বেতন নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিল। স্ত্রী বললেন, ‘তুমি সারা রাত চিন্তা করছ, কিন্তু আমাকে তো কিছু বলছ না। আমরা দুজন মিলে হিসাবটা করি।’
কথাটি শুনে কামাল চুপ করে রইল। সে এত দিন ধরে মনে করছিল, পরিবারের সব দায়িত্ব একা তারই বহন করতে হবে। নিজের ভয় প্রকাশ করাকে সে দুর্বলতা ভাবত। তাই কাউকে কিছু না বলে নিজের মাথার ভেতরেই সব সমস্যার সমাধান খুঁজছিল।
সেদিন তারা কাগজে মাসের খরচ লিখল। সব সমস্যা মিটে গেল না, কিন্তু কোন খরচ জরুরি আর কোনটি কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া যায়, তা বোঝা গেল। মায়ের ওষুধের জন্য আত্মীয়ের সাহায্য নেওয়ার কথাও উঠল। কামাল প্রথমবার বুঝল, যে বোঝাটাকে সে একা বইছিল, তার কিছুটা ভাগ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়।
তবু সেই রাতেই তার সব দুশ্চিন্তা চলে যায়নি। পুরোনো অভ্যাসে মন আবার ভবিষ্যতের দিকে ছুটেছে। এবার সে নিজের মনকে ধমক না দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছে, কোন সমস্যার জন্য এখনই কিছু করা সম্ভব, আর কোন আশঙ্কার উত্তর আজ রাতে তার হাতে নেই।
চিন্তা এলেই তাকে শত্রু ভাবতে হবে না। কিছু চিন্তা সতর্ক করে, কিছু ভুল ধরিয়ে দেয়, কিছু সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কিন্তু প্রতিটি চিন্তাকে সত্য ধরে নিয়ে তার পেছনে ছুটতে থাকলে নিজের জীবনটিই চিন্তার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
আগুনটা কোথায় জ্বলছে
মানুষের জীবনে মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু জীবিত অবস্থায় প্রতিটি দিনকে দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটানো অনিবার্য নয়। জীবনের দায়িত্ব থাকবে, অনিশ্চয়তা থাকবে, কিছু প্রশ্নের উত্তরও অজানা থেকে যাবে। সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে গিয়েই আমরা কখনো বর্তমানের সামান্য শান্তিটুকুও হারিয়ে ফেলি।
কামাল এখনো হিসাব করে, ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে, মায়ের ওষুধের চিন্তা করে। তার জীবন হঠাৎ সহজ হয়ে যায়নি। শুধু সে ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছে, কোনো সমস্যার সমাধান খোঁজা আর সেই সমস্যাকে মনে মনে সারাক্ষণ জিইয়ে রাখা এক নয়।
চিতার আগুন একসময় নিভে যায়। কিন্তু চিন্তার আগুন মানুষ নিজেই বয়ে বেড়াতে পারে বছরের পর বছর—কখনো এমন সব ঘটনার জন্য, যেগুলোর অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত ঘটে না।
কষ্টের আগুন সব সময় জীবন জ্বালিয়ে দেয় না; কখনো ভবিষ্যতের ভয়ে আমরা নিজেরাই বর্তমানটাকে পুড়িয়ে ফেলি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।