প্রজন্মের মূল্যবোধ সংঘর্ষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ৭ মার্চ ২০২৬
রাত নয়টা। রুমি বাবার ঘরে ঢুকল। বাবা টিভি দেখছিলেন, রিমোট হাতে।
“আমি চাকরি ছাড়ছি।”
বাবা হঠাৎ রিমোট নামালেন, চুপ করে জানালার দিকে তাকালেন। রুমির বুক কেঁপে উঠল।
“তুমি কি ঠিকভাবে ভাবেছ?” বাবা বললেন। কণ্ঠে অল্প শঙ্কা ছিল।
“হ্যাঁ, বাবাঃ আমি কিছু নতুন চেষ্টা করতে চাই। এখানে আটকে যাচ্ছি, আর কিছুই শিখছি না।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর ধীরে বললেন, “ভালো। কিন্তু ভয় তো আছে, বুঝছিস? তুমি যদি ব্যর্থ হও…।”
রুমি থমকে গেল। কথা কষতে পারল না। হাতটা কাপড়ে আটকে গেল।
“বাবা, আমি চাই চেষ্টা করতে। হারলেও… নিজেকে হারাব না।”
বাবা শুধু মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখে অল্প ছায়া, যা বোঝাচ্ছিল–ভয়, হতাশা, কিন্তু রাগ নয়।
রাতটা চুপচাপ কেটে গেল। রুমি জানালার পাশে ফোন হাতে বসে। বারবার স্ক্রিনে চোখ রাখল—কি লিখবে, কি পাঠাবে। বাবা পাশ দিয়ে গেছে, কিছু বলেননি।
পরের দিন কলেজে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা।
“বাপড়ি বুঝবে কীভাবে?” রুমি বলল।
“ঝুঁকি তো নিতেই হবে, বাপ,” একজন বন্ধু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল।
“তাহলে কীভাবে বলব?” রুমি কপালে ভাঁজ নিয়ে হাসল।
“নিজে দেখো, পরে বুঝবে!” আরেক বন্ধু যোগ করল।
বন্ধুদের সঙ্গে সহজ। বাড়ি? অন্য জগৎ। চোখ, মুখ—সব নীরব। কেউ বোঝার চেষ্টা করছে না।
রুমির মন ঘুরছে—চাকরি ছাড়ার কারণ স্পষ্ট: সৃজনশীলতা নেই, নিজের স্বপ্ন অনুসরণ করতে হবে। বাবার চুপচাপ, দীর্ঘশ্বাস, চোখের অল্প ছায়া–এই সবই রুমিকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে রাগ নয়, চিন্তা ও দুঃখ আছে।
রাত নেমেছে। রুমি শুয়ে আছে। হাত বুকের ওপর। বাবা পাশে। টিভির আলো হালকা ঝলমল করছে। দূরত্ব অনুভূত, কিন্তু চাপা।
রুমি মনে মনে ভাবছে—কতটা সময় লাগে বোঝাপড়া তৈরি হতে। শব্দের প্রয়োজন নেই সবসময়। কখনও শুধু চোখের দেখা, কখনও নিঃশ্বাসের মিলন।
এক মুহূর্ত, বাবা হঠাৎ বললেন, “শুনছি।”
রুমি কিছুটা হেসে বলল, “আমি সত্যিই চেষ্টা করতে চাই। কিছু নতুন। নিজেকে… বের করার জন্য।”
বাবা মাথা নেড়ে চুপ। আর কিছু না বলেই টিভির দিকে ফিরে গেলেন।
রুমি চোখ বন্ধ করল। বুকের চাপ কমছে। ভিতরে দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে, কিন্তু হালকা স্বস্তি। বোঝাপড়া শুরু হয়েছে, কিন্তু নিখুঁত নয়।
রাত গভীর। ঘড়ির টিকটিকি। হালকা বাতাস। রুমি শুয়ে আছে। বাবা পাশে।
দূরত্ব অনুভূত, কিন্তু চাপা নয়। চোখে ছবি আলাদা, হৃদয় স্পন্দন আলাদা।
রুমি হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ল। শান্তি আসে না, কিন্তু বোঝাপড়ার সূচনা স্পষ্ট।
ফাঁক এখনও আছে, অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে।
শব্দ ছাড়া বোঝার পথ খোলা—এটাই বাস্তব।
রুমি জানে, এই রাত একটি ছোট প্রাথমিক পদক্ষেপ।
নিঃশব্দ হলেও, সংযোগ শুরু হয়েছে।
চেষ্টা ও সময়—এটাই সেতু গড়ে তোলে।
ফাঁক রয়ে গেল, কিন্তু এখনই বোঝাপড়ার রাশ টানা শুরু হয়েছে।
শব্দহীন আলো আর ছায়ার মধ্যে, তারা দু’জনই একই ঘরে, ভিন্ন ভেতর।
আর সেটাই জীবনের বাস্তবতা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।