তপস্বী নাকি সহযাত্রী
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | মার্চ ২৫, ২০২৬
"লেখকরা তপস্বী, পাঠকরা নির্ভরশীল"—প্রথম শুনেছিলাম ২০১৯ সালে, এক সাহিত্য আড্ডায়। বলেছিলেন একজন প্রবীণ কবি, চোখে দৃঢ় বিশ্বাস। আমি তখন নতুন ব্লগার, মুগ্ধ। ভাবলাম, হ্যাঁ, এটাই তো সত্যি। লেখক একা সাধনা করেন, পাঠক শুধু গ্রহণ করে।
কিন্তু এক ঘটনা সব বদলে দিল।
২০২১ সালের একটি বৃষ্টির দিন। আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম—নিজের বাবা-মায়ের সংসার নিয়ে। মনে হয়েছিল, এটা আমার গল্প, আমার ব্যাথা। প্রকাশের পর দুই ঘণ্টায় পাঁচটি মন্তব্য এলো। প্রথমটিই আমাকে থামিয়ে দিল। একজন পাঠক লিখলেন, "আপনার বাবার কথা পড়ে আমার মনে হলো, আমার মামার কথা। উনিও তাই করতেন। কিন্তু আমি কখনো বুঝিনি কেন।"
আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মিনিট দশেক। তারপর বুঝতে পারলাম—আমি যে গল্পটি লিখেছিলাম, সেটি তার কাছে অন্য গল্প হয়ে গেছে। আমার বাবা, তার মামা। আমার ব্যাথা, তার প্রশ্ন। লেখাটি আমার হাত ছেড়ে চলে গেছে।
তখন থেকে শুরু।
আমরা প্রায়ই 'তপস্বী' ধারণাকে রোমান্টিকভাবে দেখি। একা, নীরব, গভীর চিন্তায় ডুবে থাকা—এই চিত্র মনে হয় লেখকের আসল রূপ। কিন্তু বাস্তবতা? লেখক একা কিছু করেন না। প্রতিটি শব্দ পাঠকের দিকে তাকিয়ে লেখা হয়, অনিচ্ছাকৃতভাবেই। আমি যখন লিখি, অবচেতনে একজন পাঠককে কল্পনা করি। তিনি কী বুঝবেন, কোথায় হাসবেন, কোথায় থেমে যাবেন—সবই মাথায় থাকে।
এটি দুর্বলতা নয়। এটি সাহিত্যের স্বভাব।
'লেখকের মৃত্যু' ধারণাটি রোলাঁ বার্থের। তিনি বলেছিলেন, লেখা প্রকাশিত হলে লেখকের নিয়ন্ত্রণ শেষ। পাঠক নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে অর্থ তৈরি করে। আমি প্রথমে ভাবতাম, এটা তো লেখকের অপমান। কিন্তু এখন মনে হয়, এটি মুক্তি। আমি আর একা নই। আমার লেখা আমার নয়, এটি আমাদের হয়ে ওঠে—আমি এবং অজ্ঞাত পাঠকের সংলাপে।
বাংলা ব্লগিং জগতে এখনো 'গুরু-শিষ্য' মানসিকতা প্রবল। দেখেছি, অনেক সিনিয়র ব্লগার নিজেদের 'উৎস' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের ভাষায়—"আমি শেখাই, পাঠক শেখে।" কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে অন্য কথা। গত বছর একজন নতুন লেখক আমার একটি পুরনো পোস্ট নিয়ে লিখলেন। সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ। প্রথমে রাগ হলো। মনে হলো, উনি বুঝেননি। কিন্তু পড়তে পড়তে বুঝলাম—উনি বুঝেছেন, কিন্তু আমার চেয়ে ভিন্নভাবে। এবং সেই বোঝাটিও বৈধ।
এই মুহূর্তে আমি বুঝি—পাঠক নির্ভরশীল নয়। পাঠক নির্বাচক। তারা ঠিক করেন কোন লেখা বাঁচবে, কোনটি মরবে। আমি যতই নিজেকে তপস্বী ভাবি না কেন, যদি কেউ না পড়েন, তাহলে শব্দগুলো কেবল সার্ভারে আটকে থাকে। কোনো শ্বাস নেয় না।
তবে 'সহযাত্রী' ধারণাও সরল নয়। কিছু ক্ষেত্রে অসমতা অপরিহার্য। একবার একজন পাঠক আমার কবিতা নিয়ে লিখলেন—আমার মনের ভাবনা ব্যাখ্যা করছেন। কিন্তু আমি জানি, আমি সেই ভাবনায় লিখিনি। তখন প্রশ্ন হলো—পাঠকের ব্যাখ্যার সীমা কোথায়? একবার আমার এক কবিতা পড়ে একজন বললেন, এটি রাজনৈতিক। আমি ভাবিনি। কিন্তু তার ব্যাখ্যা শুনে দেখলাম, আমার অবচেতনে হয়তো ছিল। নাকি তার অভিজ্ঞতা এমন? আমি উত্তর পাইনি। হয়তো উত্তর নেই।
শেষ পর্যন্ত, সবচেয়ে শক্তিশালী লেখক তিনি নন যিনি নিজেকে তপস্বী ভাবেন। তিনি যিনি জানেন—তার প্রতিটি বাক্য পাঠকের সঙ্গে সংলাপ। এবং সেই সংলাপ কখনো শেষ হয় না, কখনো পূর্ণ হয় না, কখনো নিখুঁত হয় না। ঠিক এই অসম্পূর্ণতায় সাহিত্যের প্রাণ।
আমি এখনো মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি—যদি পাঠক সমান হয়ে যায়, তাহলে আমার বিশেষত্ব কোথায়? উত্তর পেলে জানাবো। বা না-ও পেতে পারি।
আপনার কী মনে হয়? কখনও কি আপনার লেখা বা পড়া কিছু এমনভাবে আপনাকে বদলে দিয়েছে? একবার একজন পাঠক আমাকে লিখেছিলেন, আমার একটি গল্প পড়ে তার বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন দশ বছর পর। আমি ভাবিনি আমার লেখা এত দূর যাবে। আপনার এমন অভিজ্ঞতা আছে?
#লেখকপাঠক #সাহিত্যচিন্তা #বাংলাব্লগ #সমালোচনা #লেখালেখি #বৌদ্ধিকআলোচনা #ReaderVsWriter #CreativeThinking
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।