ছায়ার গল্প
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৪ আগষ্ট, ২০২৬
পুরোনো বাংলা সাহিত্য হাতে নিলেই মাঝে মাঝে কেমন যেন থমকে যেতে হয়। ভাষা আমাদের, মানুষগুলোও চেনা। তবু কোথাও একটা অচেনা ভঙ্গি লেগে থাকে।
গল্পের মাটি এখানকার, কিন্তু তার হাঁটাচলায় অন্য কোনো ছাঁচের ছাপ দেখা যায়।
উপনিবেশিক সময়টা কেবল শাসনের সময় ছিল না। ওটা ছিল অভ্যাস ভাঙা আর নতুন অভ্যাস গড়ার সময়ও। ইংরেজি স্কুল-কলেজে পড়ে যে সমাজ তৈরি হলো, তারা শেক্সপিয়ার পড়ল, ইউরোপীয় উপন্যাস পড়ল, নতুন ধরনের নাটক দেখল।
তারা যখন কলম ধরল, তখন তাদের চিন্তার সঙ্গে ওই পড়াশোনার ছাপ মিশে গেল। ফলে বাংলা গল্পের গড়নটাই বদলে গেল।
আগে গল্প বলার ধরন ছিল সোজাসাপ্টা। ঘটনার পর ঘটনা। উনিশ শতকের শেষ থেকে সেই গল্পের ভেতর চরিত্রের মন ঢুকতে শুরু করল। মানুষ শুধু কাজ করছে না, সে ভাবছে। দ্বিধায় পড়ছে। নিজের সঙ্গে লড়াই করছে। এই ভেতরের টানাপোড়েনটা পাশ্চাত্য উপন্যাস থেকে এসেছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু তাই বলে সবটাকে নকল বললে অন্যায় হবে। কাঠামো হয়তো ধার করা। ভেতরের রক্ত, মাংস, হাড়—সবই এ দেশের।
বাংলার পরিবার, বাংলার সমাজ, উপনিবেশের চাপ, জমিদারের অত্যাচার, মেয়েদের নীরবতা—এসবই তো সেই গল্পের বিষয়। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র কেউই ইউরোপের নকল করেননি। তাঁরা ইউরোপীয় যন্ত্র দিয়ে নিজেদের পৃথিবী বানিয়েছেন।
তবু মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি থেকেই যায়। লোকসাহিত্য, পালাগান, মঙ্গলকাব্য—হাজার বছরের এই ধারাগুলো হঠাৎ করে “উচ্চ সাহিত্য”র তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেল কেন?
কারণটা সহজ। শহরের শিক্ষিত পাঠকের রুচি বদলাল। প্রকাশক, সম্পাদক, পত্রিকাও সেই রুচির দিকে তাকাল। ইংরেজি শিক্ষায় তৈরি যে মানদণ্ড, তার সঙ্গে যেটা মিলল না, সেটা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে গেল। আঞ্চলিক ভাষা, গ্রামের অভিজ্ঞতা, মৌখিক গল্প—সব একটু কোণঠাসা হয়ে গেল।
এখানেই আসে আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। আমরা কি তখন নিজের চোখে নিজেকে দেখছিলাম?
নাকি অন্যের চোখ ধার নিয়ে দেখছিলাম?
সাহিত্যে যে সমাজ উঠে এল, সেটা কি পুরো বাংলা সমাজ?
নাকি শুধু শিক্ষিত ভদ্রসমাজের জীবন?
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না।
আবার পুরো ব্যাপারটাকে কালো আর সাদায় ভাগ করাও ঠিক হবে না। পাশ্চাত্য আঙ্গিক এসেছে ঠিকই। কিন্তু সেই আঙ্গিকের ভেতর দিয়ে আমাদের গল্পই বলা হয়েছে। ফলে একটা মিশ্র অবস্থা তৈরি হলো। না পুরোপুরি অনুকরণ, না পুরোপুরি স্বাধীনতা। এই টানাপোড়েন, এই দোটানা—এটাই আসলে বাংলা আধুনিক সাহিত্যের আসল চেহারা।
উপনিবেশের আরেকটা মানসিক প্রভাব ছিল আরও গভীর। ইংরেজি জানা মানেই আধুনিক। ইংরেজি জানা মানেই উন্নত। এই ধারণা সমাজে শেকড় গাড়ল। তার ফলেই “উচ্চ সাহিত্য” আর “লোকজ সাহিত্য”র মধ্যে একটা দেওয়াল উঠে গেল। নিজের ধারাগুলো নিজের কাছেই ছোট হয়ে গেল। একটা সাংস্কৃতিক দ্বিধা জন্ম নিল। আমরা কি নিজেরা যথেষ্ট?
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা একই আছে। আমরা কি সেই প্রভাব থেকে পুরোপুরি বের হতে পেরেছি? পারিনি। এখনো আমরা পাশ্চাত্য তত্ত্ব দিয়ে নিজের সাহিত্যের বিচার করি। আবার একই সঙ্গে লোকজ ধারাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। টানাপোড়েনটা শেষ হয়নি। শুধু তার রূপটা বদলেছে।
তাই উপনিবেশিক প্রভাবকে শুধু ক্ষতিকর বলা যায় না। আবার শুধু উপকারীও বলা যায় না। এটা একই সঙ্গে চাপ ছিল, আবার সুযোগও ছিল। আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। এই ধার নেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আমরা নিজের সত্তাটাকে কতটা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি?
আমার মনে হয়, ওই প্রভাব আমাদের সাহিত্যকে না পুরোপুরি ক্ষতি করেছে, না শুধু দরজা খুলেছে। বরং এই দ্বন্দ্বটাই আমাদের সাহিত্যকে এত জটিল, এত বহুস্তর আর এত প্রাণবন্ত করেছে। আমরা যদি শুধু নিজের ছাঁচে থাকতাম, হয়তো গল্পগুলো আলাদা হতো। আবার যদি পুরোটা ধার নিতাম, তাহলে গল্পগুলো আমাদের থাকত না। আমরা দাঁড়িয়ে আছি ঠিক মাঝখানে। আর সেই মাঝখানটাই আমাদের জায়গা।
আপনার কী মনে হয়?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।