যে স্বাদ এড়ানোর উপায় নেই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আল্লাহ তাআলা কেন বলেননি, ‘প্রত্যেক প্রাণীই মারা যাবে’? কেন বলেছেন, ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’
মৃত্যু তো কোনো খাবার নয়, পানীয়ও নয়। তাহলে ‘স্বাদ গ্রহণ’ কেন?
কোরআনের এই আয়াত আমরা বহুবার পড়ি। কিন্তু একটি শব্দের ভেতর যে গভীর অর্থ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা নিয়ে সব সময় ভাবি না।
মৃত্যু এমন একটি ঘটনা নয়, যা শুধু অন্যের জীবনে ঘটে। একদিন এটি প্রত্যেক মানুষের নিজের অভিজ্ঞতা হয়ে আসবে।
আমরা অন্যের মৃত্যু দেখতে পারি। প্রিয় মানুষকে হারিয়ে কাঁদতে পারি। জানাজায় দাঁড়াতে পারি। কবরের পাশে মাটি দিতে পারি। কিন্তু নিজের মৃত্যুর মুহূর্ত অন্য কেউ আমাদের হয়ে অনুভব করতে পারবে না।
সম্ভবত এখানেই ‘মৃত্যুর স্বাদ’ কথাটির গভীরতা।
জীবনে আমরা অনেক কিছু এড়িয়ে যেতে পারি। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে পারি। বিপদ এলে সরে যেতে পারি। অপমান হলে জায়গা বদলাতে পারি। দুঃখ এলে নিজেকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখতে পারি।
মৃত্যুর ক্ষেত্রে এমন কোনো পথ খোলা নেই।
দুনিয়ার ব্যস্ততায় আমরা জীবনের অস্থায়িত্ব ভুলে থাকি। শরীর একদিন থেমে যাবে, প্রিয় মানুষগুলো একদিন চলে যাবে, আমরাও একদিন থাকব না—এসব জানি, তবু প্রতিদিনের কাজে সেগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখি।
মৃত্যু এসে সেই ভুলে থাকার সুযোগটুকু শেষ করে দেয়।
তবে ধর্মীয় বিষয়ে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোরআন ও সহিহ হাদিসে যতটুকু বলা হয়েছে, তার বাইরে প্রচলিত কোনো কথা বা নিজের কল্পনাকে নিশ্চিত ধর্মীয় সত্য হিসেবে বলা ঠিক নয়। মৃত্যুর সময় রূহ শরীরের কোন অংশ দিয়ে কীভাবে বের হয়, তার প্রতিটি ধাপ নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। কিন্তু সেগুলোর সবই কোরআনের সরাসরি বক্তব্য নয়।
যতটুকু নিশ্চিতভাবে জানা যায়, মৃত্যুর সময় মানুষের জন্য সাকারাত বা মৃত্যুযন্ত্রণা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ
নিজেও মৃত্যুর কষ্ট অনুভব করেছেন। তাই নেককার মানুষ মানেই তার মৃত্যু সম্পূর্ণ কষ্টহীন হবে—এমন ধারণারও ভিত্তি নেই।
তবে একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু মৃত্যু নয়, মৃত্যুর পর কী অপেক্ষা করছে।
মৃত্যু সবার জন্য একই দরজা। কিন্তু সেই দরজার ওপারের পরিণতি সবার এক নয়।
কেউ সারা জীবন আল্লাহকে ভুলে থেকেছে, অন্যায় করেছে, মানুষের হক নষ্ট করেছে। ভেবেছে, পরে একদিন তওবা করবে।
আবার কেউ নিজের ভুল বুঝে ফিরে এসেছে। নামাজে দাঁড়িয়েছে, অন্যায় ছেড়েছে, মানুষের পাওনা ফিরিয়ে দিয়েছে, ক্ষমা চেয়েছে এবং আল্লাহর কাছে ফিরে এসেছে।
বাইরে থেকে দুজনের জীবন হয়তো খুব আলাদা মনে হয়নি। দুজনই সংসার করেছে, বাজার করেছে, হেসেছে, অসুস্থ হয়েছে। কিন্তু তাদের ভেতরের পথ এক ছিল না।
মৃত্যুর স্মরণ তাই জীবন থেকে আনন্দ কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। বরং জীবনকে ঠিকভাবে বেছে নেওয়ার জন্য।
যে জানে একদিন চলে যেতে হবে, সে হয়তো প্রতিটি রাগকে শেষ কথা মনে করবে না। বাবার সঙ্গে অভিমান করে ফোন না ধরার আগে একবার ভাববে। সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময় মোবাইলটা পাশে রাখবে। কারও পাওনা আটকে রাখার আগে মনে করবে, সব হিসাব মিটিয়ে যাওয়ার সময় হয়তো খুব বেশি নেই।
আমরা বলি, ‘একদিন সময় পেলে তওবা করব।’
‘একদিন সামর্থ্য হলে দান করব।’
‘অবসর নিলে নামাজে মন দেব।’
কিন্তু মৃত্যু কোনো পরিকল্পনা দেখে আসে না।
তাই ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে’ শুধু মৃত্যুর ঘোষণা নয়। এটি জীবিত মানুষের জন্যও একটি প্রশ্ন।
আমরা জানি না, সামনে আর কতগুলো সকাল আছে।
কিন্তু আজ কী করব, সেই সিদ্ধান্ত এখনো আমাদের হাতে।
কারও কাছে ক্ষমা চাওয়ার থাকলে আজই চাইতে পারি। কারও হক ফিরিয়ে দেওয়ার থাকলে আজই দিতে পারি। নামাজে অবহেলা করে থাকলে আজ থেকেই ফিরে দাঁড়াতে পারি। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দূরে সরে গেলে আজই আবার শুরু করতে পারি।
মৃত্যু কখন আসবে, তা আমরা জানি না। কিন্তু মৃত্যুর আগে কেমন মানুষ হয়ে উঠব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনো আছে।
তাই আজ রাতে নিজেকে একটি প্রশ্ন করা যায়—
যদি এটাই আমার জীবনের শেষ রাত হয়, তাহলে আল্লাহর সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি কি প্রস্তুত?
উত্তরটা অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু হয়তো এই অস্বস্তিই আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজন।
কারণ মৃত্যুর সময় বদলানোর ক্ষমতা আমাদের নেই।
কিন্তু মৃত্যুর আগে নিজেকে বদলে নেওয়ার সুযোগ এখনো আছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ঈমানের সঙ্গে জীবন শেষ করার তাওফিক দিন এবং উত্তম পরিণতি দান করুন।
আমিন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।