সুপারহিরো আমাদের গল্পেও লুকিয়ে আছে!
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | মার্চ ২৪, ২০২৬
আপনি কি জানেন, আমাদের ক্লাসিক সাহিত্যেও "সুপারহিরো" চরিত্রের গোপন রূপ আছে?
প্রথমে ভাবুন—সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান। লাল কেপ, মাস্ক, শক্তি। কিন্তু আমি যখন রবীন্দ্রনাথের "খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন" পড়ি, তখন কী দেখি? একজন বৃদ্ধ, ভাঙা পায়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, নাতির জন্য উপহার নিয়ে ছুটে চলেছেন। কোনো শক্তি নেই, কোনো মাস্ক নেই। কিন্তু আমার চোখ, জলে ভরে যায়। কেন?
কারণ এটিও সুপারহিরোর মতোতা। শুধু ভিন্ন রূপে।
আমরা প্রায়ই ভুল করি। মনে করি, সাহস মানে অস্ত্র হাতে তোলা, দৃঢ়তা প্রদর্শন, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই। কিন্তু আমাদের সাহিত্য বলে, সাহস মানে কখনও কখনও চুপ করে থাকা। কখনও কখনও ক্ষমা করা। কখনও কখনও ভুল স্বীকার করা।
রবীন্দ্রনাথের গল্পে "ছুটি"। অপু, দুর্গা মরে গেছে, মা কাঁদছেন না। তিনি অপুকে বলছেন, "বাবা আসবে, ছুটি কাটাবে।" ভেতরে ভাঙা, বাইরে দৃঢ়। এটি কি সুপারহিরো নয়? একজন মা, যে নিজের ব্যাথা চাপা দিয়ে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখেন?
আমি নিজে দেখেছি। আমার মা, বাবা অসুখে মারা যাওয়ার পর, আমাদের বলেছিলেন, "তোমরা পড়াশোনা করো।" কাঁদেননি আমাদের সামনে। পরে রাতে শুনতাম। সেই দৃঢ়তা—কোনো কমিক্সে পাইনি। রবীন্দ্রনাথে পেয়েছি।
শরৎচন্দ্রের "দেবদাস"। সবাই দেবদাসের কথা বলে। কিন্তু আমি চন্দ্রমুখির কথা বলি। একজন বেশ্যা, সমাজের "অপবিত্র", যে দেবদাসকে শুধু ভালোবাসেন না, "বাঁচাতে" চান। তার সাহস কোথায়? সমাজের চোখে "পতিত", কিন্তু নৈতিকতায় "উচ্চতর"। তিনি যখন দেবদাসকে মদ ছাড়তে বলেন, যখন তার জন্য প্রার্থনা করেন—এটি সুপারহিরো মুহূর্ত। ছোট। নীরব। কিন্তু শক্তিশালী।
আমি ভাবি, আমাদের সমাজে কত চন্দ্রমুখি আছেন। যাদের কাজ "ছোট", কিন্তু প্রভাব "বড়"। যারা নিজেদের বাঁচিয়েও অন্যকে বাঁচান। তাদের গল্প কে লেখে?
সেলিনা হোসেনের "হালদা মনি"। একজন নারী, যুদ্ধের পর, সব হারিয়ে, নতুন করে শুরু। কোনো বিশেষ ক্ষমতা নেই। কিন্তু আছে "বেঁচে থাকার" সাহস। এটি কি কম? আমি মনে করি না। বেঁচে থাকা, বিশেষ করে যখন সব শেষ—এটি সবচেয়ে বড় সাহস।
আমার এক বন্ধু, যুদ্ধে বাবা হারিয়েছিলেন। মা তাকে একা মানুষ করেছেন। কোনো "হিরো" ছিলেন না। কিন্তু আমার বন্ধু বলতো, "আমার মা আমার সুপারহিরো।" সেলিনা হোসেনের মনি, আমার বন্ধুর মা—একই গল্প। বিভিন্ন নামে।
কেন আমরা এগুলো দেখতে পাই না? কেন শুধু বিদেশি কমিক্সের দিকে তাকাই?
আমি মনে করি, কারণ আমাদের "সুপারহিরো" এর সংজ্ঞা ভুল। আমরা ভাবি, তাকে "বিশেষ" হতে হবে। কিন্তু আমাদের সাহিত্য বলে, "সাধারণ" মানুষই সবচেয়ে বিশেষ। তাদের ছোট মুহূর্তগুলো—একটি কথা, একটি সিদ্ধান্ত, একটি ক্ষমা—পরিবর্তন করে দেয়।
রবীন্দ্রনাথের "কাবুলিওয়ালা"। রহমত, একজন অজানা মানুষ, ছোট মেয়েটির জন্য কাঁদেন। তার নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে। সেই কান্না, সেই স্পর্শ—এটি সুপারহিরো নয়? নৈতিকতার সাহস, মানুষ হওয়ার দৃঢ়তা?
আমি একবার দোকানদারকে দেখেছিলাম। এক গরিব মেয়ে কিছু কিনতে এসেছিল, টাকা কম। দোকানদার বললেন, "নিয়ে যাও, পরে দিও।" ছোট ঘটনা। কিন্তু আমার দিন বদলে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এত "সাধারণ" মানুষ, এত "বিশেষ"।
শেষ পর্যন্ত, আমাদের সাহিত্য আমাকে শেখায়। সুপারহিরো মানে শক্তি নয়, মানে মন। মানে নৈতিক সাহস। মানে অন্যকে বাঁচানোর চেষ্টা, নিজেকে বিপদে ফেলেও।
আমরা সবাই পারি। আমাদের ভেতরেও লুকিয়ে আছে। শুধু সুযোগ চাই। আর সাহিত্য, সেই সুযোগের কথা মনে করিয়ে দেয়।
আপনার প্রিয় সাহিত্য চরিত্রের এমন মুহূর্ত মনে আছে যা আপনাকে হিরো মনে করিয়েছে? কমেন্ট করুন—আমি শুনতে চাই। হয়তো আমরা একই চরিত্র বলব, হয়তো ভিন্ন। কিন্তু সেই মুহূর্তগুলো, সেই সাহস—একই। লুকিয়ে আছে, অপেক্ষা করছে, আবিষ্কার হতে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।