ভেতরের ক্লান্তি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ৩১ মে , ২০২৬
আমাদের এখানে শরীরের অসুখ মানুষ সহজে বুঝে।
জ্বর হলে বলে ডাক্তার দেখাও। হাত কেটে গেলে ওষুধ এনে দেয়। কিন্তু কেউ যদি বলে, “কিছু ভালো লাগছে না”, “মাথার ভেতর সব সময় চাপ লাগে”, “কিছুতেই মন বসে না”, তখন বেশিরভাগ মানুষ ব্যাপারটা তেমন গুরুত্ব দেয় না।
উল্টো এমনসব কথা বলে, যেগুলো শুনলে মানুষ আরও চুপ হয়ে যায়।
“এত চিন্তা করিস কেন?”
“এসব তোর মাথার মধ্যে।”
“মানুষের কত সমস্যা, তুই আবার কী নিয়ে কষ্টে আছিস?”
“বাইরে ঘুরে আয়, ঠিক হয়ে যাবে।”
সবকিছু ঠিক হয়ে যায় না।
এই কথাটা আমরা এখনও ঠিকভাবে মানতে শিখিনি।
আমার নিজেরও একটা সময় মনে হতো, মন খারাপ মানে সাময়িক ব্যাপার। কয়েক দিন গেলে ঠিক হয়ে যায়। পরে বুঝেছি, কিছু কষ্ট চুপচাপ মানুষের ভেতরে বসে থাকে।
আমাদের অনেকের কাছেই মানসিক সমস্যা মানে একেবারে পাগল হয়ে যাওয়া। এর মাঝেও যে অনেক ধরনের কষ্ট আছে, সেটা নিয়ে খুব কম কথা হয়।
অথচ বাইরে থেকে কাউকে দেখে বোঝার উপায়ও থাকে না অনেক সময়।
মানুষ অফিস করছে, ক্লাস করছে, বন্ধুদের সঙ্গে হাসতেছে, ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছে। সব স্বাভাবিক লাগছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে হয়তো সে একদম ক্লান্ত।
রাতে ঘুম হচ্ছে না। ছোট ছোট বিষয়েও রাগ উঠে যাচ্ছে। কারও ফোন ধরতে ইচ্ছা করছে না। মানুষের সঙ্গে কথা বলতে কেমন যেন বিরক্ত লাগে।
এই জিনিসগুলো বাইরে থেকে সব সময় ধরা পড়ে না।
আর যেটা চোখে দেখা যায় না, সেটা মানুষ সহজে বিশ্বাসও করতে চায় না।
আমার মনে হয়, সবচেয়ে খারাপ জায়গাটা হলো, অনেক মানুষ নিজের কষ্টটার ভাষাই খুঁজে পায় না।
বিশেষ করে ছেলেরা।
ছোটবেলা থেকে শুনতে শুনতে বড় হয়,
“ছেলেরা কাঁদে না।”
“এত দুর্বল হলে চলবে?”
“এত আবেগ দেখাস কেন?”
একসময় তারা আসলেই চুপ হয়ে যায়।
তারপর সেই চেপে রাখা জিনিসগুলো অন্যভাবে বের হয়। কেউ খুব রাগী হয়ে যায়। অনেকে আবার সব মানুষ এড়িয়ে চলে। আবার কেউ ছোট ছোট বিষয়েও হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়।
আমরা তখন শুধু আচরণটা দেখি।
ভেতরের কারণটা দেখি না।
একটা বাচ্চা স্কুলে খুব জেদ করছে। সবাই বলছে, “ছেলেটা সমস্যা।” কিন্তু কেউ জানে না, বাসায় সে কী দেখে বড় হচ্ছে।
একজন মানুষ খুব খিটখিটে হয়ে গেছে। আমরা বলি ব্যবহার খারাপ। কিন্তু হয়তো সে অনেক দিন ধরে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না।
কেউ হঠাৎ সবার সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে। আমরা ভাবি অহংকারী হয়ে গেছে। অথচ হয়তো সে নিজের সঙ্গেই লড়তে লড়তে ক্লান্ত।
আমরা মানুষকে খুব তাড়াতাড়ি বিচার করি।
কিন্তু বোঝার চেষ্টা কম করি।
এই কারণেই অনেক মানুষ সাহায্য চাইতে ভয় পায়। কারণ তারা জানে, মানুষ শুনবে কম, বিচার করবে বেশি।
আমাদের দেশে এখনও কাউন্সেলিং বা থেরাপি নিয়ে অদ্ভুত ধারণা আছে।
কেউ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে ফিসফিস শুরু হয়। কেউ কাউন্সেলিং নিলে অনেকে বলে, “এত দুর্বল নাকি?” কেউ ডিপ্রেশনের কথা বললে বলা হয়, “এসব কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে।”
কিছু জিনিস ঠিক হয়।
কিছু জিনিস ভেতরে জমতে জমতে আরও ভারী হয়।
ধর্ম অনেক মানুষের জন্য শান্তির জায়গা, এটা সত্যি। কিন্তু শুধু “ধৈর্য ধর” বললেই একজন মানুষের ভেতরের কষ্ট শেষ হয়ে যায় না।
কারণ মানসিক ক্লান্তিও সত্যি জিনিস।
যেমন কেউ ইচ্ছে করে অসুস্থ হয় না, তেমনি কেউ ইচ্ছে করে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে না।
আর একটা জিনিস আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।
মানুষ যখন বারবার অনুভব করতে শুরু করে যে তাকে কেউ বুঝবে না, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই ঢুকে যায়।
বাইরে থেকে তখন তাকে স্বাভাবিকই লাগে।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ক্লান্ত হয়ে যায়।
তাই কাউকে “ড্রামাবাজ”, “পাগল” বা “অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ” বলার আগে একটু থামা দরকার।
সব সমস্যার সমাধান আমাদের জানা লাগবে না। অনেক সময় মানুষ শুধু চায়, কেউ তাকে মন দিয়ে শুনুক।
সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা না।
বরং নিজের কষ্টটা মুখে বলতে পারাটাই অনেক কঠিন।
যেমন শরীর খারাপ হলে ডাক্তার দেখানো স্বাভাবিক, তেমনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে সাহায্য নেওয়াও স্বাভাবিক।
কারণ সব ক্ষত চোখে দেখা যায় না।
কিছু ক্ষত মানুষ একা একাই নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
চুপচাপ।
#মানসিকস্বাস্থ্য #সচেতনতা #বাংলালেখা #জীবন #মানুষ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।