নিশির দিনগুলো
গল্প-৭ : ঈদের দিন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১৫ জুলাই, ২০২৬
সবাই যখন নতুন কাপড় কিনতে ব্যস্ত, তখন সে হিসাব করছিল চাল-ডালের দামের।
ঈদের আর কয়েক দিন বাকি।
অফিস ছুটির পর পুরো বাজারটা মানুষে ভরে গেছে। কোথাও জামা-কাপড়ের দোকান, কোথাও জুতার দোকান। ছোট ছোট বাচ্চারা নতুন পোশাক পরে আয়নার সামনে ঘুরে ঘুরে দেখছে।
নিশিও একটা দোকানের সামনে দাঁড়াল।
মেঘের জন্য নীল রঙের একটা কামিজ খুব সুন্দর লাগল। মিশির জন্য সাদা একটা জামা।
দোকানদার দাম বলতেই নিশি আস্তে করে বলল,
"আচ্ছা, পরে আসছি।"
সে জানত, আর আসা হবে না।
বাড়ি ফিরে ব্যাগ থেকে টাকাগুলো বের করে টেবিলে রাখল। তারপর একটা খাতা খুলে লিখতে শুরু করল।
চাল।
ডাল।
তেল।
চিনি।
সেমাই।
সব লিখে শেষে আবার টাকাগুলো গুনল। হিসাবটা কোনোভাবেই মিলছে না।
ঠিক তখনই মিশি এসে পাশে বসল।
"মা, আমার গত ঈদের জামাটা এখনও ভালো আছে। এবার না কিনলেও হবে।"
নিশি অবাক হয়ে তাকাল,
"কে বলল তোকে?"
মিশি হেসে বলল, "বলতে হয় নাকি? আমি বুঝি।"
কথাটা শুনে নিশির বুকটা হালকা কেঁপে উঠল।
এর মধ্যে মেঘও এসে বলল,
"আমারও কিছু লাগবে না। আগে বাজারটা করো।"
নিশি জোর করে হেসে বলল,
"তোদের দুজনকে ছাড়া ঈদ হয় নাকি?"
মেঘ উত্তর দিল,
"হয় না। কিন্তু তোমাকে চিন্তায় রেখেও ঈদ হয় না।"
সেই রাতে নিশির আর ঘুম এল না। বারবার মনে পড়ছিল, অভিক বেঁচে থাকলে ঈদের আগে কত পরিকল্পনা করত। কোন দিন বাজার করবে, কোথায় ঘুরতে যাবে, সব আগে থেকে ঠিক করা থাকত।
এখন তাকে একাই সব হিসাব করতে হয়।
পরদিন অফিসে ঈদের বোনাস পেল। টাকাটা হাতে নিয়ে সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর প্রথমে বাজার করল। যা যা দরকার, সবটুকু কিনল। সবশেষে অনেক ঘুরে সাধ্যের মধ্যে দুই মেয়ের জন্য দুটো জামা কিনল। নিজের জন্য কিছুই নিল না।
ঈদের আগের রাতে প্যাকেট দুটো বের করতেই মিশি অবাক হয়ে বলল,
"তুমি তো বলেছিলে কিনবে না!"
নিশি হেসে বলল,
"মা হয়ে সব কথা রাখতে নেই।"
মিশি হেসে মাকে জড়িয়ে ধরল।
মেঘ তখন চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ বলল,
"মা... তোমার নতুন শাড়ি কোথায়?"
নিশি সহজ গলায় বলল,
"আমার আলমারিতে অনেক শাড়ি আছে।"
মেঘ কিছু বলল না। সে জানত, আলমারির শাড়িগুলোর বেশির ভাগই অনেক বছরের পুরোনো।
ঈদের সকালে দুই বোন নতুন জামা পরে বাবার ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
মিশি ছবিটার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,
"বাবা থাকলে আজ নিশ্চয়ই আমাদের নিয়ে বের হতো।"
রান্নাঘর থেকে কথাটা শুনে নিশির হাত থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর চোখটা মুছে স্বাভাবিক গলায় ডাক দিল,
"এসো, সেমাই খেয়ে নাও।"
তিনজন মিলে টেবিলে বসে নাশতা করল। খাবার খুব বেশি ছিল না। তবু সেই সকালটায় একটা জিনিসের কোনো অভাব ছিল না।
একসঙ্গে থাকার আনন্দ।
নিশি সেদিন মনে মনে শুধু একটা কথাই বলেছিল,
"অভিক, আমি চেষ্টা করছি। ওদের ঈদটা যেন ঈদের মতোই থাকে।"
চলবে.........গল্প-৮ : একাকী রাত (সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর নিশি বারান্দায় গিয়ে বসত। চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠত। পাশের ফ্ল্যাটের আলোগুলো একে একে নিভে যেত।)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।