কুসংস্কার কেন গল্পে এত আকর্ষণীয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, প্রাবন্ধিক
নিবন্ধ। এপ্রিল ১০, ২০২৬
মানুষের মানসিক গঠনের ভেতরে এক ধরনের টানাপোড়েন কাজ করে—একদিকে জানার তীব্র আগ্রহ, অন্যদিকে অজানাকে ঘিরে এক অদ্ভুত সংকোচ। এই টানাপোড়েনটাই অভিজ্ঞতাকে কেমন যেন ধারালো করে তোলে। কুসংস্কার সম্ভবত সেই সূক্ষ্ম জায়গাতেই কাজ করে। ফলে বাংলা সাহিত্যে এটি কেবল একটি বিষয় হয়ে থাকে না; ধীরে ধীরে এক ধরনের বর্ণনাভঙ্গিতে পরিণত হয়—যা পাঠককে টেনে নেয়, খানিকটা গা ছমছম ভাব তৈরি করে, এবং শেষে একধরনের অপূর্ণ অনুভূতি রেখে যায়।
অজানাকে ব্যাখ্যা করার প্রশ্নটি এখানে কেন্দ্রে। যখন কোনো ঘটনার স্পষ্ট কারণ মেলে না, মানুষ প্রায়ই সহজ কোনো ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে—যেটি সবসময় যুক্তিনির্ভর নাও হতে পারে। সাহিত্যে এই প্রবণতাকে ব্যবহার করা হয়েছে, তবে সরলভাবে নয়। একটি বন্ধ ঘর, হালকা শব্দ, কিংবা কোনো অনির্দিষ্ট উপস্থিতির আভাস—এসব আলাদা করে খুব ভয়ংকর নয়। কিন্তু একসঙ্গে এলে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়। মনে হয়, কিছু একটা আছে—কিন্তু ঠিক কী, ধরা যাচ্ছে না। এই অনিশ্চিত অবস্থানেই কুসংস্কারের জায়গা তৈরি হয়।
এখানে একটু থামা যায়। ভাবলে দেখা যাবে, কুসংস্কার আসলে বাইরের কোনো ঘটনার চেয়ে বেশি ভেতরের প্রতিক্রিয়া। আমরা সবাই কিছু অস্পষ্ট ভয় বয়ে বেড়াই—যেগুলোকে পরিষ্কার ভাষায় ধরতে পারি না। অন্ধকারে একা থাকলে হঠাৎ গা ছমছম করে কেন? কিংবা কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশে দাঁড়িয়ে মনে হয়—এখানে যেন কিছু ঠিক নেই। সাহিত্যে যখন এই অনুভূতিগুলো ধরা পড়ে, গল্পটা আর দূরের কিছু থাকে না। পাঠক নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজতে শুরু করে। সেখানেই এর আসল টান।
বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক মুহূর্ত আছে যেখানে ভয়কে সরাসরি দেখানো হয় না। বরং একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়—সবকিছু স্বাভাবিক, তবুও যেন সামান্য কিছু সরে গেছে। যেমন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তারানাথ তান্ত্রিক’-এর গল্পগুলোতে বারবার এই আবহ তৈরি হয়—ঘটনাগুলোকে পুরোপুরি অস্বীকারও করা যায় না, আবার নিঃসংশয়ে বিশ্বাসও করা যায় না। এই দ্বিধাটাই পাঠককে আটকে রাখে।
এই ‘স্বাভাবিকতার ফাঁক’টাই হয়তো কুসংস্কারের আসল জায়গা। এটি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, আবার একেবারে অস্পষ্টও নয়। পাঠক বুঝতে পারে—কিছু একটা ঘটছে, কিন্তু সেটিকে ভাষায় ধরতে পারে না। ফলে গল্পটি পড়া শেষ হলেও তার ভেতরের খচখচানি থেকে যায়।
এখানে আরেকটি স্তর কাজ করে—বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝামাঝি এক ধূসর অঞ্চল। গল্প এগোতে থাকলে পাঠক বারবার ভাবতে থাকে, সে যা পড়ছে তা কি সত্যিই ঘটছে, নাকি চরিত্রের বিশ্বাস সেটিকে এমন করে তুলছে? এই দোলাচল সহজে মেটে না। বরং যত এগোয়, তত জটিল হয়। মনে হতে পারে, নিশ্চিত উত্তর থাকলে গল্পটি হয়তো এতটা দীর্ঘস্থায়ী হতো না।
সামাজিক দিকটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কুসংস্কার অনেক সময় ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়; এটি একটি সমাজের ভেতরে তৈরি হয়, ছড়িয়ে পড়ে, এবং কখনো নির্দিষ্ট মানুষদের ঘিরে শক্ত হয়ে ওঠে। সাহিত্যে যখন এই বিশ্বাসগুলো আসে, তখন তা কেবল ভয় তৈরি করে না—বরং প্রশ্ন তোলার সুযোগও দেয়। পাঠক তখন গল্পের বাইরে তাকাতে শুরু করে: এই বিশ্বাসগুলো কোথা থেকে এল, কেন টিকে আছে?
তবুও একটি সংশয় থেকে যায়। কুসংস্কার কি কেবল গল্পকে আকর্ষণীয় করার কৌশল, নাকি এটি আমাদের মানসিক কাঠামোর গভীরে থাকা কোনো দুর্বলতার ইঙ্গিত? হয়তো উত্তরটা মাঝামাঝি কোথাও। আমরা নিজেদের যুক্তিবাদী ভাবতে ভালোবাসি, কিন্তু অজানার মুখোমুখি হলে সেই আত্মবিশ্বাস টলে যায়। তখন পুরোনো বিশ্বাস, শোনা কথা, কিংবা অস্পষ্ট ধারণাগুলো আবার ফিরে আসে। সাহিত্য সম্ভবত এই ভঙ্গুর মুহূর্তগুলো ধরতে পারে বলেই এত প্রভাব ফেলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, কুসংস্কার গল্পকে শুধু পড়ার মতো করে না—মনে গেঁথে যাওয়ার মতো করে তোলে। গল্প শেষ হয়ে গেলেও তার ভেতরের প্রশ্নগুলো থেকে যায়। সত্যিই কি কিছু ঘটেছিল, নাকি সবটাই বিশ্বাসের তৈরি? এই দ্বিধার কোনো নির্দিষ্ট সমাধান মেলে না।
দিনশেষে প্রশ্নটা আমাদের সবার কাছেই ফিরে আসে—আমরা কি ভয় পেতে চাই, নাকি সত্যটা জানতে চাই?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।