গাড়ির যত্ন, নিজের অবহেলা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৩১ অক্টোবর ২০২৬
গ্যারেজে দাঁড়িয়ে লোকটা গাড়ির টায়ারে হাত বুলিয়ে দেখছেন। কোথাও ধুলো জমেছে কি না, টায়ারের বাতাস ঠিক আছে কি না, সবই তাঁর নজরে। গাড়িটা নতুন নয়, তবু যত্নের অভাব নেই। অথচ গত তিন মাস ধরে বুকের বাঁ পাশে চিনচিনে ব্যথাটা হচ্ছে। কাজের ব্যস্ততায় একবারও চিকিৎসকের কাছে যাওয়া হয়নি।
গাড়ির সামান্য সমস্যা তাঁর চোখ এড়ায় না, কিন্তু নিজের শরীরের অস্বস্তিটুকু তিনি দিনের পর দিন এড়িয়ে চলেছেন।
এমন মানুষ আমাদের চারপাশে কম নেই। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ বদলে গেলে দুশ্চিন্তা হয়, যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে কত টাকা লাগবে তার হিসাব চলে। অথচ শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লেও, ঘুম ঠিকমতো না হলেও কিংবা দীর্ঘদিন ধরে কোনো অস্বস্তি চলতে থাকলেও আমরা নিজেদের বোঝাই—কিছু হবে না, পরে দেখা যাবে।
সেই ‘পরে’ আর সহজে আসে না।
সম্পদের হিসাব, শরীরের নয়
একটি গাড়ি কিনতে মানুষ বছরের পর বছর সঞ্চয় করেন। ঋণ নেন, কিস্তি দেন, প্রয়োজনে নিজের অনেক শখ বিসর্জন দেন। গাড়িটি তাঁর পরিশ্রম, সাফল্য ও সামাজিক অবস্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে সেটির সামান্য ক্ষতিও তাঁর কাছে বড় বিষয়।
অন্যদিকে, শরীরের ক্ষতি অনেক সময় চোখে পড়ে না বলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কেউ নিয়মিত ধূমপান করেন, কেউ গুটখা বা তামাকজাত দ্রব্যের অভ্যাস ছাড়তে পারেন না, কেউ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া পিছিয়ে দেন। আবার কেউ কাজের চাপে খাবার ও ঘুমের সময়টুকুও ঠিক রাখতে পারেন না।
সব ক্ষেত্রে কারণ এক নয়। কারও অর্থের অভাব, কারও চিকিৎসাসেবায় পৌঁছানোর অসুবিধা, কারও আবার নিজের অভ্যাস বদলানোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের লড়াই। তাই শরীরের যত্ন না নেওয়াকে শুধু ব্যক্তিগত অবহেলা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—যে শরীর দিয়ে মানুষ উপার্জন করেন, পরিবারকে সময় দেন, স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করেন, সেই শরীরের জন্যই তাঁর সময় এত কম কেন?
যে ক্ষতি টাকায় মেটে না
ধরা যাক, একজন মানুষের পঞ্চাশটি গাড়ি আছে। তাঁর সম্পদের অভাব নেই, ইচ্ছা করলেই নতুন গাড়ি কিনতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘদিন নিজের শরীরের প্রতি অবহেলার কারণে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
তখন সেই গাড়িগুলোর কোনোটিই তাঁর সুস্থতা ফিরিয়ে দিতে পারবে না। সম্পদ চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে পারে, ভালো সেবার ব্যবস্থা করতে পারে, কিন্তু শরীরের প্রতিটি ক্ষতি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
কিডনি বা যকৃতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি হলে তার প্রভাব শুধু অসুস্থ ব্যক্তির ওপর পড়ে না; পরিবারের জীবনও বদলে যেতে পারে। চিকিৎসার খরচ, দীর্ঘদিনের পরিচর্যা, কাজের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়, যার জন্য পরিবার মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না।
অথচ অসুস্থতার আগের দিনগুলোতে হয়তো মানুষটি ভেবেছিলেন, তাঁর কিছু হবে না। শরীর তো এত দিন ঠিকই চলেছে!
নিজের জন্যও সময় রাখা
নিজের যত্ন নেওয়া মানে সব কাজ ফেলে বিশ্রাম নেওয়া নয়। কাজের পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজনগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক চলাফেরা, প্রয়োজনমতো চিকিৎসা এবং ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা—এসবও জীবনের অংশ।
মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সব দায়িত্ব একা কাঁধে নিয়ে চলা, নিজের কষ্ট কাউকে না বলা কিংবা বিশ্রাম নিলেই অপরাধবোধে ভোগা—এসবকে সব সময় শক্তির পরিচয় ভাবা ঠিক নয়।
পরিবারের জন্য উপার্জন করা জরুরি, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাও জরুরি। সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে গিয়ে সেই ভবিষ্যৎ গড়ার মানুষটির শরীরের কথা ভুলে গেলে হিসাবটা একসময় অন্য রকম হয়ে যেতে পারে।
শরীরের সহ্যক্ষমতাকে আমরা প্রায়ই সুস্থতার প্রমাণ বলে ধরে নিই। অথচ কোনো সমস্যা না টের পাওয়া আর শরীরের কোনো সমস্যা না থাকা এক কথা নয়।
গ্যারেজের লোকটা হয়তো আজও টায়ারের ধুলো মুছছেন। বুকের ব্যথাটা আছে, কিন্তু গাড়ির মতো নিজের শরীরটাও যে একদিন যত্ন চায়, সেটা তাঁর মনে পড়ছে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।