প্রবাসী একাকীত্বের খরচ
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ডিসেম্বর ২৯, ২০২৫
তুমি কি কখনো ভেবেছো, প্রতি মাসে যে কোটি কোটি টাকা প্রবাসীরা দেশে পাঠান, তার পিছনে লুকিয়ে আছে আরেকটা 'অদৃশ্য রেমিট্যান্স'? এটা টাকা নয়, বরং একাকীত্ব, ডিপ্রেশন আর অদৃশ্য ক্ষত – যা বিদেশে জমা হয়, আর ফিরে আসে পরিবারের কাঁধে।
আমি রাকিবকে চিনি। সৌদি আরবে ১২ বছর ধরে লেবারের কাজ করে। প্রতি মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা পাঠায় বাড়ি – বাবা-মায়ের চিকিৎসা, বোনের বিয়ে, ভাইয়ের পড়াশোনা। গ্রামে সবাই বলে, "রাকিব ভাইয়ের রেমিট্যান্সে বাড়ি উঠেছে।" কিন্তু কেউ জানে না, রাকিবের রুমে রাতে কেউ কথা বলার নেই। ঈদের দিন ভিডিও কলে সন্তানের "বাবা কবে আসবে?" শুনে চোখের পানি লুকিয়ে হাসে। ফোন কেটে একা বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ডিপ্রেশন এসে ধরেছে অনেক আগে, কিন্তু বলার কেউ নেই। "দেশে বললে ওরা চিন্তা করবে," এই ভেবে চেপে রাখে।
এই গল্প শুধু রাকিবের নয়। লক্ষ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশীর। মধ্যপ্রাচ্যের গরম বালুর নিচে, ইউরোপ-আমেরিকার ঠাণ্ডা শহরে – সব জায়গায় একই একাকীত্ব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলে, প্রবাসীদের মধ্যে ডিপ্রেশন, অ্যাঙ্গজাইটি আর পোস্ট-ট্রম্যাটিক স্ট্রেসের হার সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে যারা পরিবার ছেড়ে গেছে, তাদের মধ্যে লোনলিনেস এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে অনেকে ফিরে আসার পরও স্বাভাবিক হতে পারে না। রিটার্নি মাইগ্রেন্টদের মধ্যে ট্রমা, ডিপ্রেশন আর এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে – কারণ বিদেশের কষ্ট, অপমান, শোষণের স্মৃতি তাড়া করে ফেরে।
এখন ভাবো অর্থনৈতিক দিকটা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ড ৩০ বিলিয়ন ডলারের ওপর – এটা দেশের অর্থনীতির রক্ত। গার্মেন্টসের পরই সবচেয়ে বড় উৎস। কিন্তু এই টাকার পিছনে কত মানসিক খরচ? প্রবাসীরা যে একাকীত্ব সহ্য করে, সেই 'অদৃশ্য রেমিট্যান্স' দেশে ফিরে এসে পরিবারকে ভাঙে। স্ত্রী একা সংসার সামলাতে গিয়ে ডিপ্রেশনে পড়ে, সন্তানরা বাবার অভাবে বিগড়ে যায়, রিটার্ন করা প্রবাসী ফিরে এসে চাকরি না পেয়ে হতাশায় ডুবে যায়। একটা গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবাসী পরিবারে ডিভোর্সের হার বেড়েছে, সন্তানদের মধ্যে মানসিক সমস্যা বেড়েছে – সবই এই অদৃশ্য খরচের ফল।
কেন এমন হয়? কারণ আমরা শুধু টাকাটা দেখি, মানুষটাকে দেখি না। প্রবাসীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সাপোর্ট নেই বললেই চলে। বিদেশে কাউন্সেলিং সেন্টার কম, দেশে ফিরে পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা নেই। সমাজে স্টিগমা – "প্রবাসী তো টাকা কামায়, তার আবার ডিপ্রেশন কীসের?" এই কথায় অনেকে মুখ খুলতে পারে না। ফলে কষ্ট চেপে রাখে, আর একদিন ভেঙে পড়ে।
কিন্তু এটা বদলাতে পারে। যদি আমরা প্রবাসীদের একাকীত্বকে স্বীকার করি। কমিউনিটি গ্রুপে কথা বলার সুযোগ দিই, অনলাইন কাউন্সেলিং চালু করি। দেশে রিটার্নি প্রবাসীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য প্রোগ্রাম আর চাকরির সুযোগ বাড়াই। পরিবারগুলোকে সচেতন করি যে, টাকার সাথে মানসিক স্বাস্থ্যও পাঠাতে হবে – নিয়মিত কথা বলে, ভিডিও কলে সময় দিয়ে।
আমি বিশ্বাস করি, প্রবাসীরা শুধু অর্থনীতির যোদ্ধা নন, তারা আমাদের পরিবারের অংশ। তাদের একাকীত্বকে উপেক্ষা করলে আমরা নিজেদেরই ক্ষতি করছি। আজ থেকে শুরু করি – একজন প্রবাসীকে ফোন করে জিজ্ঞেস করি, "ভাই, তুমি ঠিক আছো তো?"
তোমার কোনো প্রবাসী আত্মীয় বা বন্ধু আছে? তাদের গল্প শেয়ার করো কমেন্টে। যাতে অন্যরা বুঝতে পারে, এটা শুধু পরিসংখ্যান নয়, আমাদের জীবনের অংশ। আর এই পোস্টটা শেয়ার করো – যাতে আরও মানুষ সচেতন হয়। একসাথে আমরা এই খরচ কমাতে পারি।
#প্রবাসী_একাকীত্ব #অদৃশ্য_রেমিট্যান্স #প্রবাসী_মানসিক_স্বাস্থ্য #প্রবাসী_জীবন #বাংলাদেশী_প্রবাসী #MentalHealthMatters #ExpatLifeBD
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।