বিচারব্যবস্থা—সময়ের কারাগারে বন্দি ন্যায়বোধ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ
তারিখঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৫
বিচার—যা এক সময় ছিল রাষ্ট্রের বিবেক, সমাজের নৈতিক স্তম্ভ—আজ যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে কাগজের গহ্বরে। আদালতের দালান-কোর্টরুমের ফাঁকে এখন শুধু নীরব অপেক্ষা; বছরের পর বছর ধরে মানুষ পায়ে হেঁটে আসে ন্যায় খুঁজতে, আর ফিরে যায় “পরবর্তী তারিখ” নিয়ে। রায় নয়, বরং তারিখই যেন আজ বিচারব্যবস্থার প্রকৃত উত্তরাধিকার।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৫ লাখেরও বেশি মামলা পড়ে আছে অচল প্রক্রিয়ার জালে।
নিম্ন আদালতে ঝুলে আছে ৩.৬৯ মিলিয়ন মামলা, আর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগেও অমীমাংসিত ৩৭ হাজারের বেশি মামলা।
(The Daily Star, ২০২৫; New Age, ২০২৫
এ যেন রাষ্ট্রের শরীরে গভীর ক্ষত—এক নীরব গ্যাংগ্রিন, যেখানে ব্যথার অনুভূতিও ক্রমে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিদিন অসংখ্য বিচারপ্রার্থী আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে—ফাইল হাতে, চোখে অনুরোধের রেখা। কেউ দুই মাস, কেউ ছয় মাস, কেউ বছরজুড়ে অপেক্ষা করে কেবল একটি শুনানির আশায়। অবশেষে যখন তারিখ আসে, আদালত জানায়—“এটি জরুরি বিষয় নয়, রেগুলার কোর্টে যান।”
প্রশ্ন জাগে—যদি বিষয়টি জরুরি না হয়, তবে কেন মামলাটি তালিকাভুক্ত করা হলো? কেন একজন মানুষকে দিনের পর দিন এই মানসিক ও আর্থিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হলো?
এ এক অদ্ভুত পরিহাস—যেখানে আদালত বিচারপ্রার্থীর শেষ আশ্রয় নয়, বরং এক নতুন যন্ত্রণার সূচনা।
এই বিপর্যয় হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর মূলে আছে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা গঠনগত দুর্বলতা।
বিচারক সংকট: মামলার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কম, ফলে একটি ফাইল শেষ না হতেই আরেকটি ফাইল এসে বোঝা বাড়ায়।
প্রক্রিয়াগত জটিলতা: অপ্রয়োজনীয় তারিখ পরিবর্তন, বিলম্বিত নোটিশ, অযৌক্তিক adjournment—সব মিলিয়ে ন্যায় বিলম্বের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা: ই-ফাইলিং, ডিজিটাল শুনানি বা কোর্ট ম্যানেজমেন্টে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব প্রক্রিয়াকে ধীর করে রেখেছে।
দায়বদ্ধতার অভাব: কোনো মামলায় বিলম্ব হলে তার যুক্তি বা কারণ জানানো হয় না। জনগণের করের টাকায় চলা আদালতগুলোর কাছ থেকে এমন নীরবতা অন্যায়ই নয়, অপমানও।
যে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার পেতে মানুষকে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়, সেখানে “ন্যায়” শব্দটি একসময় শুধু অভিধানে বেঁচে থাকে—বাস্তবে নয়।
মানুষের অনুভূতি ও নৈতিক ক্ষয় বিচার বিলম্ব মানে শুধু সময় নষ্ট নয়, এটা আত্মমর্যাদার মৃত্যু।
যে মানুষ সত্যের আশায় আদালতের দোরগোড়ায় আসে, বারবার “পরবর্তী তারিখ” শুনে ফিরে গেলে তার ভেতরের বিশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।
সেই অবিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় ভয়ঙ্কর সামাজিক রোগ—“অন্যায়কে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি।”
যখন অন্যায়কে সহ্য করা স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের শিরায় প্রবাহিত হয় দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, এবং ন্যায়ের প্রতি উদাসীনতা।
সমাধানের পথ: সাহস, সদিচ্ছা ও কাঠামোগত পরিবর্তন এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব—যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রযুক্তিগত সাহস এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা একসঙ্গে কাজ করে।
বিচারক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো: মামলার চাপ অনুযায়ী পর্যাপ্ত মানবসম্পদ নিশ্চিত করতে হবে।
সময়সীমা নির্ধারণ: প্রতিটি মামলার জন্য নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সময়সীমা নির্ধারণ করা এবং বিলম্বের কারণ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ডিজিটাল কোর্ট প্রতিষ্ঠা: ই-ফাইলিং, ভার্চুয়াল শুনানি এবং অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে।
মধ্যস্থতা ও সালিশ সংস্কৃতি জোরদার: ছোটখাটো বিরোধ আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হলে বিচারব্যবস্থার চাপ কমবে।
দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা: প্রতিটি কোর্টের পেন্ডিং মামলার হিসাব, শুনানির সংখ্যা ও গড় বিলম্ব সময় জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
এগুলো কেবল নীতিগত পরামর্শ নয়—এগুলো রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার শর্ত।
বিচারব্যবস্থা কেবল আদালতের নয়, এটি একটি জাতির নৈতিক মেরুদণ্ড।
যখন জনগণ বিশ্বাস হারায় বিচারপ্রক্রিয়ায়, তখন রাষ্ট্রের পতন শুরু হয় ভিতর থেকে—নীরবে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।
তাই এখনই সময় জেগে ওঠার—বিচারক, আইনজীবী, প্রশাসন ও জনগণ—সবাইকে নিয়ে।
ন্যায়বোধ যদি হারিয়ে যায়, তাহলে সংবিধান কেবল একটি কাগজ, আর রাষ্ট্র একটি প্রহসন ছাড়া কিছুই নয়।
#বিচারব্যবস্থা #ন্যায়সংকট #বিচারবিলম্ব #বিচারহীনতার_সংস্কৃতি #বাংলাদেশের_বিচারব্যবস্থা #আইনসংস্কার #সুশাসন #ন্যায়ের_আর্তনাদ #নাগরিক_অধিকার #VoiceForJustice #enolej_idea #JusticeDelayedJusticeDenied #RuleOfLaw #BreakTheSilence #ReformTheCourts #AccessToJustice #Accountability #CourtBacklog #HumanRightsInBangladesh #CryForChange #VoiceOfThePeople #JudicialReform #StateOfJustice #বিচারপ্রার্থীর_অপমান #ন্যায়বিচার #অবিচারের_চিত্র
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।