কিশোরদের মানসিক সংকট আমরা কেন দেখতে পাই না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ৭ মার্চ ২০২৬
রাহি আমার পাশের বাড়ির ছেলে। বয়স সতেরো। গত বছর এই সময়টায় আমাদের গলির ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিল। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরেই ব্যাট হাতে মাঠে নেমে যেত।
এখন তার ঘরের দরজা বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে। রাতে জানালার ফাঁক দিয়ে ফোনের নীল আলো দেখা যায়।
একদিন রাহির মা আমাকে বলছিলেন,
“ছেলেটা আগের মতো নেই। সারাক্ষণ ঘরে থাকে। ওর বাবা বলেন—এই বয়সে এমন হয়।”
কথাটা খুব অচেনা নয়। বরং খুব পরিচিত।
অনেক পরিবারেই কিশোরদের আচরণের এই পরিবর্তনকে “মুড সুইং” বলে ধরে নেওয়া হয়। কৈশোরে এমন হয়—এই ব্যাখ্যাটি এত সহজ যে এর আড়ালে অন্য সম্ভাবনাগুলো প্রায়ই অদৃশ্য হয়ে যায়।
কিন্তু বাস্তবতা হয়তো এত সরল নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ কিশোর–কিশোরী কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হয়। সংখ্যাটা বড় মনে হতে পারে। কিন্তু আরও বড় বিষয় হলো—এই সমস্যাগুলোর অনেকটাই কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ধরা পড়ে না।
কারণ মানসিক সংকট সাধারণত নাটকীয়ভাবে শুরু হয় না।
এটি আসে ধীরে ধীরে।
আচরণের ছোট পরিবর্তন দিয়ে।
একদিন দেখা যায় বন্ধুদের সঙ্গে বের হওয়া কমে গেছে।
ঘুমের সময় বদলে গেছে।
খাওয়ার ইচ্ছা কমেছে।
এগুলো আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে খুব বড় কিছু মনে হয় না। কিন্তু একসঙ্গে জমতে থাকলে তারা অন্য কিছুর ইঙ্গিত দেয়।
এক সন্ধ্যায় রাহির ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গিটারের শব্দ শুনেছিলাম। সে আগে গিটার বাজাত না। সুরটা খুব পরিষ্কারও ছিল না—মনে হচ্ছিল বারবার একই জায়গায় আটকে যাচ্ছে।
হঠাৎ সুরটা থেমে গেল।
তারপর আর কোনো শব্দ নেই।
আমি কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারপর চলে এলাম।
এই নীরবতার ভেতরে কী আছে—তা বোঝা সবসময় সহজ নয়।
আজকের কিশোরদের জীবনে চাপের ধরনও বদলেছে।
একটি বড় পরিবর্তন এসেছে তুলনার সংস্কৃতিতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সাফল্য, সৌন্দর্য বা জনপ্রিয়তার সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করা এখন অনেক কিশোরের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা।
সকালে ঘুম ভাঙার পর ফোন হাতে নেওয়া—
দিনের শুরুতেই অন্যদের “ভালো থাকা”র প্রদর্শন দেখা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, ভালো চাকরি, সামাজিক মর্যাদা—সবকিছুই যেন একটি ক্রমাগত প্রতিযোগিতার অংশ। এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় এমন অনুভূতি তৈরি করে যে মানুষকে শুধু সফল হলেই গ্রহণ করা হবে।
আর একটি বিষয় আছে, যেটা প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়।
অনেক পরিবারেই আবেগ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার ভাষা তৈরি হয়নি। দুঃখ, উদ্বেগ বা বিভ্রান্তির কথা বললে তা কখনো দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়, কখনো অপ্রয়োজনীয় নাটক বলে মনে করা হয়।
ফলে অনেক কিশোর নিজের অনুভূতিগুলোকে ভাষায় প্রকাশ করার আগেই সেগুলো চেপে রাখতে শেখে।
ষোল থেকে পঁচিশ বছর বয়সের সময়টাকে অনেকেই জীবনের একটি অদ্ভুত সেতুবন্ধন বলে মনে করেন।
এই সময় মানুষ স্কুলের নিরাপদ পরিবেশ ছেড়ে বড় জগতে পা রাখে। একদিকে পরিবার, অন্যদিকে স্বাধীনতা—দুটোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু ঠিক এই সময়েই সহায়তার ব্যবস্থায় এক ধরনের ফাঁক তৈরি হয়। শিশুদের জন্য যে কাঠামো থাকে, তা তখন আর পুরোপুরি কার্যকর থাকে না। আবার প্রাপ্তবয়স্কদের জগতে প্রবেশও সহজ হয় না।
ফলে অনেক তরুণ যেন মাঝখানের এক শূন্যতায় ঝুলে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে কিশোরদের আচরণকে শুধুই “সমস্যা” হিসেবে দেখলে হয়তো আসল প্রশ্নটা ধরা পড়ে না।
কখনো কখনো মনে হয়—সমস্যাটা শুধু তাদের নয়।
সম্ভবত সেই পরিবেশেরও, যেখানে তারা বড় হচ্ছে।
রাহির বাবাকে একদিন বলতে শুনেছিলাম,
“আমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে।”
কথাটা বলার সময় রাহি পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে কিছু বলেনি। শুধু মাথা নিচু করে ছিল।
হয়তো সে ভাবছিল—তাহলে সে আসলে কে?
কিশোরদের মানসিক সমস্যাগুলো যত আগে বোঝা যায়, তত সহজে সামলানো সম্ভব। কিন্তু অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন কাজটাই হলো—প্রথম কথাটা বলা।
আমি জানি না সেদিন রাহির সঙ্গে কী বলা উচিত ছিল।
“কেমন আছিস?”—এই প্রশ্নটা কি যথেষ্ট হতো?
নাকি খুব সরল?
কয়েক দিন আগে আবার তাকে দেখেছি। সন্ধ্যার পরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে ফোন। আলোটা তার মুখে পড়ছিল।
আমি থেমেছিলাম।
কিছু বলিনি।
কখনো কখনো মনে হয়—সেই নীরব দাঁড়িয়ে থাকাটাই হয়তো এক ধরনের প্রশ্ন ছিল।
অথবা হয়তো ছিল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।