বাজারের সকাল। গলি এক জীবন্ত নদীর মতো বয়ে চলেছে—কথা, হাসি, পদচারণা আর ছোট ছোট ঝাঁকুনির ঢেউ। আড্ডার দেশের সীমান্ত পার করে, গোপাল এসে পৌঁছেছে পিতৃবাড়ি। হাতে এক ছোট্ট পাঞ্জাবী, আর পাশে ঠাসা ঠাকুরতিনটে।
বাজারে মানুষের ভিড় যেন একটি জীবন ছবি—প্রত্যেকের মুখে আলাদা গল্প। গোপাল ছোট্ট পায়ে হাঁটছে, চারপাশে মাতাল হাওয়ার গন্ধ, বিকেলের সূর্যের সোনালি রঙ মিশে আছে বালুর ধুলোয়।
ছোটুর মা হুট করে বললেন, “কাজ শেষ কর! বেলা গড়ায়, হিসেব নিকেশ করতে হবে।” হিসেব নিকেশ, শব্দগুলো যেন বাজারের শব্দের চেয়ে বেশি ভারী, একটা অদ্ভুত চাপ। দাদু খেরো খাতায় সংখ্যা গুনছেন, বাবা উচ্চস্বরে বলে যাচ্ছেন—“চারটে যাবে জুড়ি গাড়ি, বাকিটো বুড়োধাড়ি।”
গোপালের মনে প্রশ্ন—আমার গাড়ি কোথায়?
বাজারের এক কোণে নয়নতারা বসে আছে, বারান্দার ছায়ায়। তার চোখে স্মৃতির ধোঁয়া,“সবাই নাতির কাছেই আসে, বাবুয়া, নানির দিন গেছে।” গোপালের কানে বাজে এই বাক্য, যেন ভেতরের কোনো দরজার চাবি।
গোপাল ভাবতে থাকে, বাবা যদি বলেন তালেহেঁটেও আমি যেতে পারি। হাঁটা, তার কাছে শুধু পদচারণা নয়, বরং জীবনের প্রতীক। হিসেব নিকেশের জটিলতার মধ্যে লুকিয়ে আছে ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা আর একে অপরের জন্য ত্যাগের গল্প।
দাদু বলেন, “বুঝলি খোকানা, বাপের খরচ হবে, হাঁটা হবে বিধান।” সেই মুহূর্তে গোপালের ছোট্ট মনে ঘুরপাক খায়—হিসাব মানে কি শুধু সংখ্যা? না, হিসাব মানে হলো ভালোবাসা, একসাথে থাকা, আর মনের শান্তি।
বাজারের কোলাহলে গোপাল ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে। জুড়ি বাতিল, হাঁটা বেছে নেয় সে। প্রতিটি পদচারণা যেন একটি নতুন গল্পের জন্ম। মানুষের হাসি-কান্না, কাজের তাড়া, ভালোবাসা—সব মিলিয়ে বাজার হয়ে ওঠে এক জীবন্ত উপন্যাস।
গোপালের জন্য বাজার আর শুধু বাজার নয়। এটি হলো এক জীবন পাঠ,যেখানে হিসেবের বাইরে থাকে ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা, মানবতা আর একসাথে থাকার আনন্দ।
বাজারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে গোপাল চুপ করে দাঁড়ায়। চারপাশে মানুষের শব্দ ম্লান হয়ে আসে। সে বুঝে,জীবনের হিসেব মানে শুধু সংখ্যা নয়। হিসেব মানে হলো হৃদয়ের স্পন্দন, ভালোবাসা, এবং একসাথে থাকা।
বাজারের এই ছোট্ট ভিড়ের গল্প হয়ে ওঠে জীবনের এক চিরন্তন ছন্দ। আর সেই ছন্দ যেন একদিন প্রতিটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।