বাংলা সাহিত্যে সমালোচক কোথায়?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
“আমাদের সাহিত্যে প্রশংসা আছে, পরিচিতি আছে, পুরস্কার আছে—কিন্তু নির্মোহ সমালোচনা কি আছে?”
প্রশ্নটা একটু অস্বস্তিকর।
কারণ কাউকে প্রশংসা করা সহজ। একটি বই পড়ে লিখে দেওয়া যায়—“অসাধারণ”, “মুগ্ধকর”, “অনবদ্য”, “এই সময়ের সেরা লেখা”।
কিন্তু সেই একই বই পড়ে বলা—
“এই জায়গাটা দুর্বল।”
“এই চরিত্রটা বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।”
“ভাষাটা কয়েক জায়গায় কৃত্রিম।”
“লেখক যে কথাটা নতুন করে বলতে চেয়েছেন, সেটা আসলে নতুন নয়।”
এই কথাগুলো বলা অনেক কঠিন।
আর আমাদের সাহিত্যে হয়তো এই কঠিন কথাটারই অভাব সবচেয়ে বেশি।
একজন পরিচিত লেখকের নতুন বই বের হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হলো। তারপর একে একে শুভেচ্ছা, অভিনন্দন, প্রশংসা।
কেউ লিখলেন—“আপনার লেখা আমাকে মুগ্ধ করেছে।”
কেউ বললেন—“এই বই বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে।”
কেউ হয়তো বইটি পুরোপুরি না পড়েই প্রশংসা করে ফেললেন।
কিন্তু খুব কম মানুষ লিখলেন—
“বইটি পড়েছি। ভালো লেগেছে, তবে এই জায়গাগুলো নিয়ে আমার আপত্তি আছে।”
কেন?
কারণ আমরা অনেক সময় সমালোচনা আর সম্পর্ককে আলাদা রাখতে পারি না।
লেখক পরিচিত। প্রকাশক পরিচিত। সম্পাদক পরিচিত। বন্ধু, সহকর্মী কিংবা একই সাহিত্যিক পরিসরের মানুষ।
তাহলে তাঁর বই নিয়ে কঠিন কিছু বলা মানে যেন মানুষটাকেই আঘাত করা।
কিন্তু একজন লেখার সমালোচনা আর একজন লেখকের অপমান এক জিনিস নয়।
বরং ভালো সমালোচনা লেখকের প্রতি এক ধরনের সম্মান।
একজন লেখক যদি শুধু প্রশংসাই শুনতে থাকেন, তাহলে তিনি নিজের দুর্বলতাগুলো বুঝবেন কীভাবে?
আমরা সন্তানকে ভালোবাসি বলে তার সব ভুলকে ঠিক বলি না। বন্ধুকে ভালোবাসি বলে তার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সঠিক বলি না। তাহলে একজন লেখককে ভালোবাসার অর্থ কেন তাঁর প্রতিটি লেখাকে অসাধারণ বলা হবে?
সমালোচনার কাজ লেখককে ছোট করা নয়। লেখাটাকে আরও গভীরভাবে দেখা।
একটি বইয়ের কোথায় শক্তি, কোথায় দুর্বলতা, কোথায় নতুনত্ব, কোথায় পুনরাবৃত্তি—এসব নিয়ে যুক্তিসহ কথা বলাই সমালোচনা।
শুধু “ভালো” বা “খারাপ” বলা সমালোচনা নয়।
“ভালো” কেন ভালো, সেটা বলতে হয়। “খারাপ” কেন খারাপ, সেটাও ব্যাখ্যা করতে হয়। নইলে সেটা সমালোচনা নয়, ব্যক্তিগত রুচির প্রকাশ।
সত্যিকারের সমালোচনা সময় নেয়।
বইটা পড়তে হয়। লেখকের বক্তব্য বুঝতে হয়। ভাষা, চরিত্র, নির্মাণ, গঠন—সবকিছু দেখতে হয়। লেখক কী বলতে চেয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত কতটা বলতে পেরেছেন, সেই দূরত্বটাও দেখতে হয়।
তারপর বলতে হয়—
“এখানে আপনি সফল হয়েছেন।”
“এখানে আপনি আরও ভালো করতে পারতেন।”
এই সততাটুকুই হয়তো এখন সবচেয়ে প্রয়োজন।
আরেকটি সমস্যা হলো—আমরা সমালোচককে অনেক সময় শত্রু মনে করি।
কেউ একটি বইয়ের দুর্বলতা তুলে ধরলেই শুরু হয় প্রশ্ন—
“আপনি নিজে কী লিখেছেন?”
“আপনার নিজের বই কতজন পড়েছে?”
“আপনি ঈর্ষা করছেন।”
অথচ একজন সমালোচকের নিজের উপন্যাস লেখা বাধ্যতামূলক নয়, যেমন একজন চলচ্চিত্র সমালোচকের নিজের সিনেমা বানানো বাধ্যতামূলক নয়।
একজন পাঠকেরও একটি বই নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার আছে।
কারণ সাহিত্য শুধু লেখকের হাতে শেষ হয়ে যায় না। প্রকাশিত হওয়ার পর সেটি পাঠকেরও হয়ে ওঠে। পাঠক নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে তাকে পড়বেন, প্রশ্ন করবেন, দ্বিমত করবেন।
সেখান থেকেই সাহিত্যিক আলোচনা তৈরি হয়।
তবে নির্মোহ সমালোচনার জন্য শুধু সমালোচক থাকলেই হবে না। সমালোচনা গ্রহণ করার সংস্কৃতিও দরকার।
লেখককে বুঝতে হবে—সমালোচনা মানেই অপমান নয়।
পাঠককে বুঝতে হবে—দ্বিমত মানেই শত্রুতা নয়।
প্রকাশককে বুঝতে হবে—একটি বই নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া সবসময় খারাপ প্রচারণা নয়।
আর সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও বুঝতে হবে—তাদের কাজ শুধু প্রশংসা বিতরণ করা নয়; সাহিত্যের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা তৈরি করাও।
কারণ যেখানে শুধু প্রশংসা থাকে, সেখানে একসময় সবাই ভালো লেখক হয়ে যায়।
আর যখন সবাই ভালো লেখক হয়ে যায়, তখন ভালো লেখার সংজ্ঞাটাই অস্পষ্ট হয়ে যায়।
আজ নতুন লেখক আসছেন। নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হচ্ছে।
এই বিপুল লেখালেখির সময়ে সমালোচনার প্রয়োজন তাই কমেনি—বরং বেড়েছে।
কারণ এখন সমস্যাটা লেখার অভাব নয়।
সমস্যা হলো—কোন লেখাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বলার মানুষ কম।
একজন ভালো সমালোচক লেখকের শত্রু নন।
তিনি সাহিত্যের একজন কঠিন পাঠক।
তিনি লেখককে খুশি করার জন্য বসেন না। আবার অপমান করার জন্যও বসেন না।
তিনি জানতে চান—
এই লেখাটি কী বলছে?
কীভাবে বলছে?
কতটা সফলভাবে বলছে?
আর দশ বছর পরেও এর কোনো মূল্য থাকবে কি না?
প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর।
কিন্তু সাহিত্য যদি শুধু প্রশংসা পাওয়ার জায়গা হয়ে যায়, তাহলে একসময় তার ভেতরের আগুনটাই নিভে যেতে পারে।
সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখে শুধু লেখক নয়।
পাঠকও।
প্রকাশকও।
আর সেই মানুষটিও, যিনি প্রিয় লেখকের বই হাতে নিয়ে একদিন সাহস করে বলেন—
“আপনাকে আমি সম্মান করি। কিন্তু এই লেখাটার সঙ্গে আমি একমত নই।”
হয়তো বাংলা সাহিত্যের এখন সবচেয়ে বেশি দরকার সেই মানুষটির।
যিনি প্রশংসা করতে জানেন, কিন্তু প্রয়োজন হলে না বলতেও জানেন।
যিনি লেখককে আঘাত করতে চান না, কিন্তু লেখার দুর্বলতাকেও আড়াল করেন না।
কারণ কঠিন সত্য বলা কখনো কখনো সাহিত্যের প্রতি সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।