মানবতা হেলাপ্পা
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১০ ডিসেম্বর ২০২৫
রাস্তায় কেউ পড়ে গেলে আমরা দৌড়ে যাই না—প্রথমেই মোবাইল বের করি। ভিডিও করি, লাইভ করি। কারণ আজকের সমাজে সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু নয়, কেউ দেখবে না। কেউ যদি সাহায্য পায়, কিন্তু তা ভাইরাল না হয়, তাহলে সমাজের চোখে সে বাঁচেনি। এটাই আমাদের সময়ের নৈতিকতার এক ভয়ঙ্কর চিত্র।
আমরা সহজে বলি—“এই প্রজন্ম নষ্ট।” কিন্তু আসল সত্য ভিন্ন। নষ্ট হয়নি তারা; নষ্ট হয়েছে আমরা যেভাবে পৃথিবী সাজিয়েছি। আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে একটি ভিডিওর দাম অনেক বেশি, আর একটি জীবনের দাম কম। ঠিক-মিশ্র আচরণের বিচার এখন মানুষ নয়, লাইকের সংখ্যা আর কমেন্টের সংখ্যা ঠিক করে।
আজ ভালো মানুষ হওয়া আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে ভাইরাল হওয়া। আপনি যত বড় অন্যায়ই করুন, যদি তা ভাইরাল হয়, তাহলে রাতারাতি আপনি ভিলেন থেকে ভিকটিম, আর ভিকটিম থেকে হিরো হয়ে যেতে পারেন। আজ নৈতিকতা অন্যায় সংশোধন করে না—ইমেজ ঠিক রাখে।
আমরা বাস করছি এমন এক সমাজে, যেখানে ঠিক কি ভুল, সেটা বিচার করে না ধর্ম বা বিবেক। বিচার করে ট্রেন্ডিং ট্যাগ, ফর ইউ পেজ এবং নোটিফিকেশন। যে কাজটি বেশি মানুষ দেখে, সেটাই ঠিক। সত্য নয়, দৃশ্যমানতাই এখন নৈতিকতার মান।
এবং এখানেই জন্ম নিয়েছে Cancel Culture। এখানে তদন্ত হয় না, প্রমাণ লাগে না, রায় হয় ক্ষণিকের আবেগে। হাজার মানুষ একসঙ্গে নেমে আসে একজন মানুষকে সামাজিকভাবে কুচ্ছন্দ্র করতে—এবং প্রত্যেকে মনে করে, তারা ন্যায়বিচারের অংশ। এটা ন্যায় নয়, এটা ডিজিটাল লিঞ্চিং।
তরুণরা চরিত্র সংকটে নেই, তারা নির্দেশনা সংকটে। তারা আর নিশ্চিত নয় কি ভালো, কি খারাপ। কারণ ভালো-মন্দ এখন স্থায়ী নয়—এগুলো এসেছে আপডেটের মতো। আজ যা অপরাধ, কাল তা কনটেন্ট। আজ যে ভুল, কাল তা ট্রেন্ড। আমরা ভুল সংশোধন করি না, ভুলকে ভাইরাল করি।
আমরা বড়রা—পিতামাতা, শিক্ষক, মিডিয়া—সবাই মিলে শেখাই:
“ভালো হও পরে, আগে সফল হও।”
সফলতা আমরা নিজেরাই মাপি—ফলোয়ার, ভিউ, স্ট্যাটাস। চরিত্র কোথাও নেই।
শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষা পাস করানোর দিকে মনোযোগ দেয়, মানুষ তৈরি করতে শেখায় না। পরিবার শুধু দেয়; শিক্ষা দেয় না। মিডিয়া দেখায় না, শুধু ট্রেন্ড বানায়। তারপর আমরা প্রশ্ন করি—“এই ছেলেমেয়েরা এমন কেন?” তারা এমন নয়; আমরা এমন সমাজ তৈরি করেছি।
আজ আমরা এমন এক সমাজে আছি, যেখানে কেউ মৃত্যুর দৃশ্য দেখে Sad রিয়্যাক্ট দেয়, কিন্তু সাহায্য করতে সময় দেয় না। ধর্ষণের খবর ভাইরাল হয়, ভিকটিমের নিরাপত্তা নয়। নৈতিক ক্ষোভ অনলাইনে, বাস্তবে নীরবতা।
আমরা নতুন প্রজন্ম তৈরি করেছি যারা শিখছে—“যা ভাইরাল, তাই ঠিক। যা চুপচাপ থাকে, তা অদৃশ্য।” এই মানসিকতা যদি নৈতিকতা খায়, আর কী মারতে পারে?
সমাধান সহজ নয়। ফেসবুক পোস্ট দিয়ে নৈতিকতা ফিরে আসে না। নৈতিকতা ফিরে আসে যখন পরিবার আবার কথা বলার জায়গা হয়, স্কুল মানুষ তৈরি করার জায়গা হয়, রাষ্ট্র ট্রেন্ড নয়—দায়িত্বকে সম্মান দেয়।
সত্যটা হলো—নৈতিকতা মরেনি। আমরা তাকে অ্যালগরিদমের হাতে তুলে দিয়েছি।
যে সমাজ নৈতিকতা অ্যালগরিদমের হাতে দেয়, সেই সমাজ একদিন মানুষ দিয়ে নয়—ভিউ দিয়ে শাসিত হবে।
সেদিন খুব বেশি দূরে নেই।
#মানবতাহেলাপ্পা #AlgorithmicMorality #CancelCulture #ভাইরালনৈতিকতা #দৃশ্যমানতাইমান #ভিউবাজারে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।