নীরব বদল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ৩ অক্টোবর ২০২৬
সব পরিবর্তন শব্দ করে আসে না।
কিছু পরিবর্তন খুব চুপচাপ আসে। দরজায় কড়া নাড়ে না, কোনো ঘোষণা দেয় না। একদিন হঠাৎ খেয়াল হয়, আগের সেই মানুষটি আর আগের মতো নেই। যে মানুষটা প্রতিদিন সন্ধ্যায় মেয়ের সঙ্গে গল্প করত, সে এখন দরজা খুলে আগে ওষুধের বাক্স খোঁজে। যে স্ত্রী একসময় স্বামীর সঙ্গে দিনের সব কথা ভাগ করে নিত, এখন তাদের কথার বড় অংশ জুড়ে থাকে বাজার, বিল, ডাক্তার আর ওষুধের সময়।
সংসার একই থাকে। মানুষগুলোও একই থাকে।
শুধু সম্পর্কের ভেতরের কিছু জায়গা বদলে যায়।
আমরা সাধারণত পরিবর্তন বলতে বড় কোনো ঘটনাকে বুঝি। চাকরি চলে যাওয়া, বিয়ে ভেঙে যাওয়া, প্রিয় মানুষ মারা যাওয়া, বাড়ি বদলে ফেলা কিংবা হঠাৎ কোনো অসুখ। এসব পরিবর্তন চোখে পড়ে। মানুষও বুঝতে পারে, জীবনে একটা বড় কিছু ঘটে গেছে।
কিন্তু জীবনের গভীর পরিবর্তনগুলোর অনেকটাই এভাবে আসে না।
একজন বাবা হয়তো বুঝতেই পারেন না, কখন মেয়ের সঙ্গে তার প্রতিদিনের গল্পটা সপ্তাহে একদিনে নেমে এসেছে। একজন মা হয়তো টের পান না, কখন নিজের জন্য কেনা শেষ শাড়িটাও আলমারির ভেতর পড়ে আছে। স্বামী-স্ত্রী একই বিছানায় ঘুমান, একই টেবিলে খাবার খান, অথচ দিনের শেষে তাদের কথার বেশিরভাগটাই যদি হয়, “ওষুধ খেয়েছ?”, “কাল বাজারে যেতে হবে”, “বিলটা দিয়েছ?” তাহলে সম্পর্কটা আগের জায়গায় আছে কি না, সেই প্রশ্নটা একবার করা দরকার।
কিছু হারিয়ে যাওয়ার আগে তার কোনো শব্দ হয় না।
একজন মানুষ সারাদিন অন্য সবার প্রয়োজন মেটাতে মেটাতে একসময় নিজের প্রয়োজনের কথাই ভুলে যেতে পারেন। নিজের শখ, নিজের ক্লান্তি, নিজের ইচ্ছা—সবকিছু পিছিয়ে যায়। প্রথমে মনে হয়, কিছুদিনের জন্য। তারপর সেই “কিছুদিন” কখন যে কয়েক বছরে পরিণত হয়, তা বোঝা যায় না।
তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো নিজের কাছেই প্রশ্ন আসে—
আমি কি আগের মতো হাসি?
আমি কি আগের মতো কথা বলি?
আমার কাছের মানুষটি কি আমার সঙ্গে আগের মতো কথা বলতে চায়?
আমি কি শুধু দায়িত্ব পালন করছি, নাকি এখনও নিজের জীবনের ভেতর একটু জায়গা নিয়ে বেঁচে আছি?
পুরুষদের ক্ষেত্রে এই বদলটা অনেক সময় আরও নীরব।
ছোটবেলা থেকেই অনেক পুরুষকে শেখানো হয়, কাঁদা যাবে না, দুর্বল হওয়া যাবে না, সংসারের সামনে ভয় দেখানো যাবে না। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা দায়িত্ব নিতে শেখে, কিন্তু নিজের ভেতরের কথাগুলো বলতে শেখে না।
“আমি ক্লান্ত।”
“আমি ভয় পাচ্ছি।”
“আমারও মাঝে মাঝে কারও পাশে বসতে ইচ্ছে করে।”
এই কথাগুলো অনেক পুরুষের মুখে আসে না। কারণ তারা জানে না, কথাগুলো বলার জায়গাটা কোথায়।
তবে নীরব পরিবর্তন সবসময় দূরত্ব তৈরি করে না। কখনো কখনো মানুষ নীরবেই ফিরে আসে।
যে বাবা আগে মেয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় পেতেন না, একদিন অফিস থেকে ফিরে ফোনটা পাশে রেখে তার পাশে বসেন। যে স্বামী স্ত্রীর কাজকে স্বাভাবিক দায়িত্ব মনে করতেন, একদিন রান্নাঘরে গিয়ে বলেন, “তুমি বসো, আমি করি।” যে সন্তান বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলার সময় পেত না, একদিন বুঝতে পারে, বাবার আসলে টাকা নয়, একটু সময় দরকার।
এসব ঘটনা খুব ছোট।
কোনো সংবাদ হয় না। কেউ ছবি তোলে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টও হয় না।
তবু সম্পর্কের ভেতরে এগুলোর প্রভাব অনেক বড়।
আমরা প্রায়ই ভাবি, সম্পর্ক ভেঙে যায় বড় কোনো ঘটনার কারণে। বাস্তবে অনেক সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয় ছোট ছোট অনুপস্থিতি থেকে। একদিন কথা না বলা, একদিন পাশে না বসা, বারবার “পরে বলছি” বলা—এসবের কোনো একটাকে আলাদা করে বড় মনে হয় না।
কিন্তু বছর শেষে ফিরে তাকালে দেখা যায়, মানুষ দুজন একই ঘরে থেকেও অনেক দূরে চলে গেছে।
তাই পরিবর্তনকে শুধু ভয় পাওয়ার বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বয়স বদলাবে, সন্তান বড় হবে, শরীর বদলাবে, দায়িত্ব বদলাবে। সব বদল থামানোও সম্ভব নয়।
কিন্তু বদলাতে বদলাতে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।
কখনো শুধু পাঁচ মিনিট পাশে বসে থাকা দরকার।
কখনো ফোনটা নামিয়ে কারও কথা শোনা দরকার।
কখনো নিজের মানুষটাকে জিজ্ঞেস করা দরকার, “তুমি কেমন আছ?”
আর উত্তরটা শোনার জন্য একটু চুপ থাকা দরকার।
কারণ সব পরিবর্তন শব্দ করে আসে না।
কিছু পরিবর্তন নিঃশব্দে ঘরের ভেতর জায়গা করে নেয়। আর আমরা বুঝতে পারি, তখনই—যখন দেখি, জীবনটা আগের মতোই আছে, শুধু আমরা আর আগের জায়গায় নেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।