কোন সময়টা ঠিক ছিল?
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫
একটা সময় ছিল—প্রতিবাদ করলে মানুষ নেতা হয়ে উঠত।
আজ?
প্রতিবাদ করলে মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়, নিহত হয়।
এই বদলটা একদিনে হয়নি। ধীরে ধীরে হয়েছে।
আমাদের চোখের সামনেই।
এক সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছিল সম্মানের বিষয়। মানুষ জানত—যে প্রশ্ন করে, সে সমাজের দায়িত্ব নেয়। যে রাজপথে নামে, সে ক্ষমতার লোভে নয়—মানুষের পাশে দাঁড়াতে নামে। সেই ঝুঁকিই ছিল নেতৃত্বের জন্ম। ইতিহাসের প্রতিটা বড় নাম প্রতিবাদ থেকে উঠে এসেছে।
কিন্তু আজ?
আজ প্রশ্ন করাই বিপজ্জনক।
আজ সত্য বলা মানে নিজের নাম টার্গেট লিস্টে লেখা। আজ প্রতিবাদ মানে টার্গেটে থাকা।
এই বদলটা ছোট ছোট ভঙ্গিতে শুরু হয়েছিল।
“সময়টা ঠিক নয়।”
“এখন সংবেদনশীল পরিস্থিতি।”
“সবকিছু কি রাজনীতি করা দরকার?”
আমরা চুপ থেকে বাঁচার চেষ্টা করেছি। আর ঠিক তখনই, যারা চুপ থাকেনি—তারা একে একে পড়ে গেছে।
গুলিবিদ্ধ।
নিহত।
নিখোঁজ।
কারাগারে।
আমরা কী করেছি?
পোস্ট লিখেছি। হ্যাশট্যাগ দিয়েছি। দুই মিনিট নীরবতা পালন করেছি। তারপর আবার স্বাভাবিক হয়েছি।
এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া—সবচেয়ে ভয়ংকর।
যখন সমাজ অন্যায়ের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন পরিবর্তন আসতে পারে না। স্মরণ হয় শুধু।
একটা সময় রাজপথ ছিল স্বপ্নের জায়গা।
আজ রাজপথ সতর্কবার্তার জায়গা।
প্রতিটা গুলির শব্দ যেন বলে—
“এখানেই থামো। এর বেশি এগোলে এর পরিণতি দেখেছো।”
এটা কেবল রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নয়। এটা আমাদের সবার ব্যর্থতা।
আমরা প্রতিবাদী মানুষদের ভালোবাসি—কিন্তু বাঁচতে দিতে চাই না।
তারা মারা গেলে আমরা কাঁদি, কবিতা লিখি, ছবি শেয়ার করি।
তারা বেঁচে থাকলে বলি—“নিজের জীবন আগে দেখো।”
এই দ্বিচারিতা ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।
আজ যারা নিহত হচ্ছে, তারা কেউ বোকা ছিল না। তারা জানত ঝুঁকি আছে। তারা জানত, শেষটা ভালো নাও হতে পারে। তবু দাঁড়িয়েছিল।
কারণ তারা জানত—চুপ থাকাটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেটা বিশ্বাস করি?
নাকি এখন এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সবচেয়ে নিরাপদ নাগরিক হলো সেই মানুষটি, যে কিছু দেখে না, কিছু শোনে না, কিছু বলে না?
সবচেয়ে ভয়ংকর—এই মৃত্যু এখন আর আমাদের কাঁপায় না। একটা খবর আসে। একটু রাগ হয়।
তারপর স্ক্রল।
এই স্ক্রল করাই সবচেয়ে বড় সহিংসতা। কারণ রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন নাগরিক ক্লান্ত হয়ে চুপ করে থাকে।
যখন মনে হয়—“কি আর হবে?”
এই “কি আর হবে”-ই ইতিহাস মেরে দেয়।
আজ প্রতিবাদীরা আর নেতা নয়। তারা প্রতীক।
একেকটা লাশ একেকটা সীমারেখা।
যেখানে দাঁড়িয়ে সমাজকে বলা হয়—“এখান পর্যন্ত।”
আর আমরা সেই সীমা মেনে নিই।
আমরা বলি—“সময় খারাপ।”
কিন্তু প্রশ্ন করি না—কে সময়টা খারাপ করলো?
আমরা বলি—“ঝামেলায় জড়িও না।”
কিন্তু প্রশ্ন করি না—ঝামেলা কাদের জন্য তৈরি হয়েছে?
ইতিহাস খুব পরিষ্কার। যে সমাজ প্রতিবাদীদের হত্যা করে, সে সমাজ নিজের ভবিষ্যৎ হত্যা করে।
কারণ পরিবর্তন কখনো নীরবতা থেকে আসে না।
আজ প্রশ্নটা সোজা— আমরা কোন সময়ে বাঁচতে চাই?
যেখানে প্রতিবাদ মানুষকে নেতা বানায়,
নাকি যেখানে প্রতিবাদ মানুষকে লাশ বানায়?
এই প্রশ্ন আর এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এখনই থামুন। এখনই ভাবুন। এখনই চুপ থাকা বন্ধ করুন।
শেয়ার করুন। কথা বলুন। প্রশ্ন তুলুন। কারণ আজ যদি আপনি চুপ থাকেন—কাল এই পোস্টটা আপনার জন্যও লেখা হতে পারে।
#প্রতিবাদ #চুপথাকবেননা #প্রশ্নতুলুন #নীরবতারঅপরাধ #রাষ্ট্র #গণতন্ত্র #ভয়ভাঙুন #সময়কথাবলার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।