প্রত্যাশার সীমা: বাবা-মায়ের আর সন্তানের চোখে
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ২৫ নভেম্বর ২০২৫
রহিমা বেগম তার সন্তানের কবরের পাশে এসে কাঁদতে কাঁদতে কিছু ফুল রাখল।
বলল, “বাবা, আমাকে ক্ষমা করে দিও… আমি বুঝতে পারিনি।”
ঘরে ফিরে রনি, রহিমা বেগমের ছেলে, বলল,
“মা, আমি ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছি।
এর জন্য আমার অনেক কষ্ট হয়েছে।”
রহিমা বলল, “সেকেন্ড ক্লাস? তোর তো ফার্স্ট ক্লাস পাওয়াটা উচিত ছিল।
আমি তোকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি। আর তুই… এ কী রেজাল্ট করলি?”
রনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,
“মা, তুমি কি খুশি নও এই রেজাল্টে?”
“না, একদম না। আমি যা চেষ্টা করেছি, তাতে তোর কোনো অর্জন চোখে পড়ে না।
পাশের বাসার ছেলেটি ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে, এখন সে বড় একটি কোম্পানিতে চাকরি করে, লাখ টাকার বেতন পায়… আর তুই এখানে বসে আছিস।”
রনি স্থির গলায় বলল,
“মা, আমার যতটুকু সামর্থ্য, আমি তাই দিয়েছি। সত্যি বলছি, আমি অনেক পরিশ্রম করেছি।
এত পরিশ্রমের ফল যদি থাকে না, তবে কী লাভ?”
“পাশের বাসার আরেক ছেলেটি অ্যামেরিকা যাচ্ছে, আর তুই বাংলাদেশেই পড়ছিস। দেশে থাকা কি অপরাধ? নিজের দেশে থাকলে কি সম্মান থাকে না?”
রনি নিজেকে শান্ত করতে চাইলেও কান্না থামছিল না।
“মা, সবাই সমান না। হাতের পাঁচ আঙুল সমান না। আমি সবার মতো নই, সবাই সব করতে পারবে না।
যতটুকু সামর্থ্য আমার আছে, আমি ততটুকুই অর্জন করতে পারব।
আমি শুধু চাই, মা… আমি চাই তুমি আমাকে বড় অবস্থায় দেখো।”
রহিমা বোঝার চেষ্টা করল,
“হ্যাঁ, দেখতে চাই—তবে তুমি কেন সবসময় আমাকে হতাশ করো?”
রনি বিষণ্ণ হয়ে বলল,
“মা, তোমার সঙ্গে কথা বললেই হতাশ হই। এই জীবন আর ভালো লাগে না। কেউ আমাকে বোঝে না। পৃথিবী শুধু হতাশা, কাছের মানুষ বলতে কেউ নেই। বেঁচে থাকা বৃথা মনে হয়।”
এক মুহূর্তের জন্য চুপচাপ বসে রনি একগাদা ওষুধ খেয়ে ফেলল।
পরের দিন সকাল বেলায় রহিমা বেগম রনির রুমে গিয়ে ডাক দিলেন।
কিন্তু রনি আর ঘুম থেকে উঠল না।
অনেক ডাকাডাকি করেও সে আর উঠল না।
শেষ পর্যন্ত রহিমা বুঝতে পারল, তার ছেলে আর বেঁচে নেই।
রনির হাতের কাছে একটি কাগজ দেখতে পেলেন।
কাগজে লেখা ছিল,
“মা, আমি ফার্স্ট ক্লাস পেলাম না। চাকরিও পেলাম না। আমি তোমার মনের মতো ছেলে হতে পারিনি। তাই আমি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
রহিমা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“আমি যদি বুঝতে পারতাম… আজ তুই বেঁচে থাকতিস। বাবা এখন এই বৃদ্ধ বয়সে আমি কাকে নিয়ে থাকব?”
বর্তমান সমাজে অনেক সন্তানের মানসিক চাপ একই রকম।
অনেক বাবা-মায়ের অতিরিক্ত প্রত্যাশা সন্তানদের উপর মারাত্মক চাপ তৈরি করে।
প্রত্যেক বাবা-মা তাদের সন্তানের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যাশা রাখলে ভালো হয়।
সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে, তাদের হতাশ না করে, নেতিবাচক না হয়ে, সর্বদা ইতিবাচকভাবে পাশে থাকা আমাদের দায়িত্ব।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই সুন্দর পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
#প্রত্যাশারসীমা #সন্তানমানসিকস্বাস্থ্য #হতাশানিবারণ #ইতিবাচকপাশে থাকা #মানবলিখিত #পিতামাতারদায়িত্ব #মানুষেরকাহিনী
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।