বিচার দিতে গিয়ে
(দাম্পত্য, পরিবার ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২২ অক্টোবর ২০২৬
সেদিন বিকেলে নিশি ব্যাগ গোছাচ্ছিল। অভিক পাশের ঘরে বসে ছিল। দুজনের মধ্যে কথা বন্ধ। যাওয়ার আগে নিশি একবার বলল, ‘তোমার সঙ্গে কথা বলে আর লাভ নেই।’
অভিক মুখ তুলে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। তার এই চুপ করে থাকাটাই নিশির আরও রাগ বাড়িয়ে দিল। ব্যাগটা হাতে নিয়ে সে বাবার বাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে গেল।
ঝগড়াটা খুব বড় কোনো বিষয় নিয়ে শুরু হয়নি। অভিক অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত ছিল। নিশি সারাদিনের কিছু কথা বলতে চেয়েছিল। অভিক মন দিয়ে না শুনে বলেছিল, ‘এখন একটু বিশ্রাম নিতে দাও, পরে কথা বলব।’
কথাটা সাধারণ হলেও নিশির মনে হয়েছিল, তার কথার কোনো মূল্য নেই। সেখান থেকে শুরু হয় তর্ক।
বাবার বাড়িতে পৌঁছে নিশি প্রথমে চুপ করে ছিল। মা বারবার জিজ্ঞেস করায় একসময় সব খুলে বলল। মা মেয়ের চোখের পানি দেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন না। বাবা শুনে রেগে গেলেন - ‘আমরা কি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি এমন ব্যবহার সহ্য করার জন্য?’
নিশি সেদিন বাবার কথায় স্বস্তি পেয়েছিল। কিন্তু সে ভাবেনি, তার বলা কথাগুলো মা-বাবার মনে অভিক সম্পর্কে কী ধারণা তৈরি করছে।
কয়েক দিন পর অভিক নিজেই নিশিকে ফোন করল। ধীরে ধীরে অভিক বলল, সে সেদিন অফিসের চাপ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল, খারাপভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি। নিশিও স্বীকার করল, রাগের মাথায় কিছু কথা বেশি বলে ফেলেছে। কথা বলতে বলতে দুজনের অভিমান কমল। নিশি বাড়ি ফিরে এল।
অভিক দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিল। নিশি ভেতরে ঢুকল, ব্যাগটা ঘরের এক পাশে রাখল।
কিন্তু কয়েক দিন পর নিশি বুঝতে পারল, সবকিছু ঠিক হয়নি।
বাবা ফোন করে জানতে চাইলেন, অভিক আবার কোনো খারাপ ব্যবহার করেছে কি না। মা বললেন, ‘তোর মুখ দেখলেই বোঝা যায়, তুই ভালো নেই।’
অভিকও শ্বশুরবাড়িতে গেলে আগের মতো স্বচ্ছন্দ বোধ করত না।
এক রাতে অভিক জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি তোমার বাবাকে বলেছ, আমি তোমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি না?’
নিশি বলল, ‘আমি তো শুধু কী হয়েছে, সেটাই বলেছি।’
অভিক বলল, ‘আমরা তো পরে নিজেদের মধ্যে সব ঠিক করে নিয়েছি। তাঁদের কাছে কি সেই কথাটাও পৌঁছেছে?’
নিশি উত্তর দিতে পারল না।
রাগের সময় মানুষ নিজের কষ্টটাই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। পরিবারের মানুষ যখন সেই কষ্টের কথা শোনেন, তখন তাঁরা নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে থাকতে পারেন না।
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে ফেলেন, কিন্তু পরিবারের মনে তৈরি হওয়া ক্ষোভ আর দূর হয় না।
অবশ্য মারধর বা নিরাপত্তার ভয় থাকলে চুপ করে থাকা যায় না, তখন বাইরের সাহায্য লাগেই। কিন্তু সাধারণ ঝগড়া আর নির্যাতন এক নয়।
কিছুদিন পর নিশি মাকে বলল, ‘মা, আমাদের মধ্যে সমস্যা হয়। কিন্তু সব সময় শুধু ওর ভুলগুলো বললে তোমরা ওকে অন্যভাবে দেখবে। পরে আমাদের মিটমাট হলেও তোমাদের মনে সেই রাগটা থেকে যাবে।’
সেদিন রাতে অভিক বাড়ি ফিরলে নিশি তার জন্য খাবার বাড়ল। দুজনের মধ্যে সেদিনও সব বিষয়ে একমত হওয়া হয়নি। কিন্তু তারা কথা বলার চেষ্টা করছিল—একে অন্যকে হারানোর জন্য নয়, নিজেদের বোঝার জন্য।
কারণ স্বামী-স্ত্রী হয়তো একদিনের ঝগড়া ভুলে আবার পাশাপাশি বসতে পারেন। কিন্তু সেই ঝগড়ার কথা শুনে পরিবারের মনে যে অবিশ্বাস জন্মায়, তা মুছে যেতে অনেক বেশি সময় লাগে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।