যদি মরে যাই হুট করে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
জীবন নিয়ে ভাবনা। ১৬ অক্টোবর ২০২৬
যদি মরে যাই হুট করে, আমার কবরের কাছে এসো না।
শুনতে নিষ্ঠুর লাগছে, জানি। তবু কথাটা বললাম। কারণ বেঁচে থাকতে যাদের একটু সময়ের জন্য অপেক্ষা করেছি, যাদের সঙ্গে দুটো কথা বলার জন্য কতবার নিজের অভিমান গিলে ফেলেছি, তারা যদি আমার চলে যাওয়ার পর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদে, সেই কান্নার অর্থ আমি বুঝব কী করে?
আমি তো তখন আর শুনতে পাব না, কে আমাকে কতটা ভালোবাসত। দেখতে পাব না, কার চোখে জল এসেছে। জানতে পারব না, আমার অনুপস্থিতিতে কার ঘুম হারাম হয়েছে।
এসব জানার জন্যই তো বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম।
কত রাত এমন গেছে, যখন ঘরের মানুষগুলোর সঙ্গে একই ছাদের নিচে থেকেও নিজেকে ভীষণ একা মনে হয়েছে। বলতে চেয়েছি, আমারও কষ্ট হয়। আমারও কখনো কারও পাশে বসে চুপচাপ থাকার দরকার হয়। সব সময় শক্ত থাকার অভিনয় করতে করতে আমিও ক্লান্ত হয়ে যাই।
কিন্তু কথাগুলো বলা হয়নি।
কখনো ভেবেছি, বললে ঝগড়া হবে। কখনো মনে হয়েছে, বলেও লাভ নেই। যে কষ্টটা বোঝানোর জন্য এত কথা বলতে হয়, সেই কষ্ট বোঝার ইচ্ছেটাই যদি অন্য মানুষের না থাকে, তাহলে আর কী বলব?
তারপরও অপেক্ষা করেছি।
একটা ফোনের জন্য, একটা মেসেজের জন্য, সামান্য একটা প্রশ্নের জন্য—‘কী হয়েছে তোমার? আজ এত চুপচাপ কেন?’
প্রশ্নটা হয়তো খুব ছোট। কিন্তু কখনো কখনো এই ছোট্ট প্রশ্নের অপেক্ষাতেই একটা মানুষের রাত কেটে যায়।
অথচ মানুষ চলে গেলে দৃশ্যটা বদলে যায়।
যে মানুষটার কথা শোনার সময় ছিল না, তার পুরোনো মেসেজগুলো তখন পড়া হয়। যে মানুষটার পাশে বসার সময় হয়নি, তার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা হয়। যে মানুষটার কষ্টকে বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিল, তার কথা মনে করে চোখ ভেজে।
তখন সবাই বলে, মানুষটা ভালো ছিল। কাউকে কষ্ট দিতে চাইত না। নিজের কষ্ট নিজের মধ্যেই রাখত।
কিন্তু কেউ কি একবারও ভেবেছিল, কেন সে নিজের কষ্ট নিজের মধ্যে রাখত?
আমি হয়তো তেমনই একজন।
তাই বলছি, যদি মরে যাই হুট করে, আমার কবরের কাছে এসো না।
তবে কথাটার মানে এই নয় যে, তোমাদের ঘৃণা করি। বরং তোমাদের কাছ থেকেই তো সবচেয়ে বেশি কিছু চেয়েছিলাম। বড় কোনো উপহার নয়, অসাধারণ কোনো প্রতিশ্রুতিও নয়। শুধু চেয়েছিলাম, আমার বেঁচে থাকাটুকু তোমাদের কাছে একটু গুরুত্বপূর্ণ হোক।
আমি চেয়েছিলাম, আমার মন খারাপের দিনগুলোতেও কেউ পাশে বসুক। আমার ভুল হলে বুঝিয়ে দিক, কিন্তু আমার কষ্টকে তুচ্ছ না করুক। আমি চুপ করে থাকলে কেউ যেন ধরে না নেয়, আমার কিছু বলার নেই।
আমার কবরের কাছে এসো না—এই কথাটা বলছি অভিমানে, কিন্তু আমার বেঁচে থাকাটাকে অবহেলা কোরো না।
কারণ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার কথা বলার চেয়ে, জীবিত মানুষের পাশে বসে সেই ভালোবাসাটুকু প্রকাশ করা অনেক বেশি জরুরি।
মৃত মানুষের জন্য কান্না করার আগে, জীবিত মানুষটার নীরবতা একবার শুনে দেখো।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।