বিশ্রামের কাছেও অপরাধবোধ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
উদ্বেগ, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও আত্মমূল্যবোধের সংকট
১৯ অক্টোবর ২০২৬
রবিবার সকালে অফিস বন্ধ ছিল। তবু লোকটা আটটার মধ্যে কাজের টেবিলে বসে গেল। কাজের জন্য নয়—কাজ না করলে নিজেকে অকেজো মনে হয় বলে।
সামনে খোলা ছিল একটি খাতা। পাশে রাখা চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। ঘরের অন্য সবাই তখনো ছুটির সকাল উপভোগ করছে। কেউ একটু বেশি ঘুমাচ্ছে, কেউ বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে। অথচ লোকটির মনে হচ্ছিল, এভাবে বসে থাকার কোনো মানে নেই। কিছু একটা করা দরকার। কাজ শেষ করা দরকার। নতুন কিছু শুরু করা দরকার। অন্তত এমন কিছু, যা দিনের শেষে তাকে বলতে দেবে—আজকের সময়টা নষ্ট করেনি সে।
কাজের তালিকায় সেদিন জরুরি কিছু ছিল না। তবু সে তালিকা বানাল।
তার কাছে বিশ্রাম মানে শুধু শরীরকে থামিয়ে রাখা নয়; বিশ্রাম মানে যেন নিজের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো। অন্যরা ছুটির দিনে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই দুপুর পার করে দিতে পারে। কিন্তু সে পারে না। কিছুক্ষণ কাজ না করলেই মনে হয়, অন্যরা এগিয়ে যাচ্ছে আর সে পিছিয়ে পড়ছে।
কেউ তাকে অলস বলেনি। কেউ কাজ ফেলে রাখার অভিযোগও করেনি। তবু তার ভেতরে এমন একটি বিচারক বসে আছে, যে প্রতিটি অবসরকে সন্দেহের চোখে দেখে।
কাজই কি মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে?
ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখানো হয়েছে, পরিশ্রমী মানুষই সম্মান পায়। যে ছেলে ভালো ফল করে, তাকে প্রশংসা করা হয়। যে বেশি কাজ করে, তাকে দায়িত্বশীল বলা হয়। যে নিজের ক্লান্তির কথা না বলে সব সামলে নেয়, তাকে সবাই ভরসা করতে শেখে।
এই শিক্ষাগুলোর সবই ভুল নয়। পরিশ্রমের মূল্য আছে, দায়িত্ব পালন করাও জরুরি। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন মানুষ কাজ করাকে জীবনের একটি অংশ না ভেবে নিজের মূল্য প্রমাণের একমাত্র উপায় হিসেবে গ্রহণ করে।
ধীরে ধীরে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, কাজ করলে সে গুরুত্বপূর্ণ, আর কাজ না করলে তার গুরুত্ব কমে যায়। কোনো কাজে সফল হলে নিজের প্রতি সন্তুষ্টি আসে। কিন্তু একটু অবসর পেলেই সেই সন্তুষ্টি মিলিয়ে যায়। তখন মনে হয়, এতক্ষণ কিছুই করা হলো না। আজকের দিনটি বুঝি অন্যদের মতো কাজে লাগানো গেল না।
একসময় এই ধারণা এতটাই গভীরে চলে যায় যে মানুষটি আর নিজের ক্লান্তি বুঝতে চায় না। শরীর বিশ্রাম চায়, কিন্তু মন বলে—আরেকটু কাজ করো। পরিবারের কেউ পাশে বসতে বললে সে বলে, “এই কাজটা শেষ করি, তারপর আসছি।” কাজটি শেষ হলে আরেকটি কাজ সামনে আসে। তারপর আরেকটি।
এভাবে ‘তারপর’ বলতে বলতে অনেক সময় দিনের সবচেয়ে আপন মুহূর্তগুলো পেছনে পড়ে যায়।
যে বাবা সন্তানের সঙ্গে বসে গল্প করতে চেয়েছিলেন, তিনি কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রেখে বলেন, “একটু পরে আসছি।” যে স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে নিরিবিলি সময় কাটাতে পারতেন, তিনি ভাবেন, এই সময়ে আগামী সপ্তাহের কাজগুলো গুছিয়ে নিলে ভালো হতো। পরিবারের মানুষগুলো তাঁর কাছেই থাকে, কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকে পরের দিনের দায়িত্বে।
তিনি হয়তো সংসারের জন্যই এত পরিশ্রম করছেন। পরিবারের ভালো থাকা নিশ্চিত করতে চান। সন্তান যেন ভালো সুযোগ পায়, ভবিষ্যতে যেন অর্থকষ্টে পড়তে না হয়, কর্মক্ষেত্রে যেন কেউ তাঁকে অবহেলা করতে না পারে—এসব চিন্তা তাঁর কাজের পেছনে থাকতে পারে। কিন্তু যে পরিবারের জন্য তিনি এত কিছু করছেন, সেই পরিবারের সঙ্গে বর্তমান সময়টুকু উপভোগ করার সুযোগই যখন কমে আসে, তখন প্রশ্ন জাগে—তিনি ঠিক কী অর্জন করতে চাইছেন?
ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করতে গিয়ে বর্তমানকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলছেন না তো?
অন্যের সাফল্যও যখন নিজের ব্যর্থতা মনে হয়
এই মানুষটির আরেকটি অভ্যাস তৈরি হয়। অন্যের সাফল্যের খবর শুনলে তিনি আনন্দিত হওয়ার পাশাপাশি নিজের অবস্থান নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন।
কোনো সহকর্মী পদোন্নতি পেয়েছেন। পরিচিত কেউ নতুন বাড়ি কিনেছেন। বন্ধুর ব্যবসা ভালো চলছে। খবরগুলো শুনে তিনি বাইরে থেকে অভিনন্দন জানান, কিন্তু ভেতরে ভেতরে হিসাব শুরু করেন। আমি এত কাজ করেও কোথায় আছি? আমার তো আরও এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। আমি কি যথেষ্ট পরিশ্রম করছি না?
অন্যের অর্জন তখন আর শুধু অন্যের অর্জন থাকে না; নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
এভাবে তুলনা করতে করতে নিজের জীবনের অগ্রগতিও তাঁর চোখে পড়ে না। যে দায়িত্বগুলো তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন, যে কঠিন সময় পার করে এসেছেন, যে ছোট ছোট সাফল্য অর্জন করেছেন—সবকিছুই তুচ্ছ মনে হতে থাকে। কারণ তাঁর চোখ সব সময় পরের ধাপে, পরের লক্ষ্যে, অন্য কারও চেয়ে একটু এগিয়ে থাকার চেষ্টায় আটকে থাকে।
লক্ষ্য থাকা ভালো। নিজেকে উন্নত করার ইচ্ছাও স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটি লক্ষ্য যদি নিজের যোগ্যতার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে কোনো অর্জনই বেশিক্ষণ শান্তি দিতে পারে না। একটি লক্ষ্য পূরণ হলে আরেকটি সামনে আসে। কিছুক্ষণ ভালো লাগে, তারপর আবার মনে হয়, আরও বেশি করা দরকার।
এই দৌড়ের শেষ কোথায়, তা তিনি নিজেও জানেন না।
বিশ্রাম কি সত্যিই সময়ের অপচয়?
আমাদের সমাজে ব্যস্ত মানুষকে প্রায়ই গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেউ বলেন, “লোকটা সারাক্ষণ কাজের মধ্যে থাকে।” কেউ বলেন, “নিজের কথা না ভেবে সংসারের জন্য খেটে যাচ্ছে।” এই প্রশংসার পেছনে বাস্তব অবদান থাকতে পারে। অনেক মানুষ সত্যিই কঠোর পরিশ্রম করে পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু সব সময় ব্যস্ত থাকাই যে সুস্থতা বা সফলতার প্রমাণ, তা নয়। কখনো অতিরিক্ত কাজের পেছনে থাকে আর্থিক অনিশ্চয়তা, কর্মক্ষেত্রের চাপ কিংবা পরিবারের দায়িত্ব। আবার কখনো কাজের মধ্যে ডুবে থাকার সঙ্গে জড়িয়ে যায় নিজের অযোগ্য হয়ে পড়ার ভয়। কাজ থামালে যে অস্বস্তি আসে, সেটি এড়াতেই মানুষ আরও কাজ করতে থাকেন।
তবে অতিরিক্ত কাজের অভ্যাস থাকলেই কোনো নির্দিষ্ট মানসিক রোগ রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। মানুষের পরিস্থিতি, দায়িত্ব ও অভিজ্ঞতা ভিন্ন। কিন্তু বিশ্রাম নিলেই যদি নিয়মিত অপরাধবোধ হয়, কাজের চিন্তা যদি ঘুম ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে, কিংবা নিজের মূল্যকে শুধু উৎপাদনশীলতার সঙ্গে মেলাতে মেলাতে জীবন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
বিশ্রাম কোনো পুরস্কার নয়, যা সব কাজ শেষ করার পরই পাওয়া যাবে। কারণ কাজের তালিকা সচরাচর শেষ হয় না। একটি দায়িত্ব শেষ হলে আরেকটি আসে, একটি সমস্যা মিটলে নতুন সমস্যা সামনে দাঁড়ায়। সবকিছু নিখুঁতভাবে গুছিয়ে তারপর নিশ্চিন্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকলে নিশ্চিন্ত হওয়ার সময় হয়তো আর আসবে না।
মানুষের শরীরের যেমন সীমা আছে, মনোযোগেরও সীমা আছে। ক্লান্ত অবস্থায় কাজ চালিয়ে যাওয়া সব সময় বেশি ভালো ফল দেয় না। কখনো বিরতি নেওয়া, ঘুমানো, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা কিছুক্ষণ কোনো কাজ না করাও জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ।
নিজেকে এই অনুমতি দেওয়া সহজ নয়, বিশেষ করে যখন বহু বছর ধরে নিজের মূল্য কাজের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। তবু ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু করা যায়। ছুটির দিনে নির্দিষ্ট কিছু সময় কাজ থেকে দূরে থাকা, পরিবারের সঙ্গে বসলে বারবার ফোন না দেখা, বিশ্রামের সময় নিজেকে দোষ না দিয়ে মনে করিয়ে দেওয়া—সব সময় কাজ না করলেও আমি আমার দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাচ্ছি না।
আর যদি কাজ থামালেই তীব্র অস্বস্তি হয়, নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বাড়তে থাকে কিংবা উদ্বেগ দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলা সহায়ক হতে পারে। সবকিছু একা সামলানোর চেষ্টা করাই শক্তির একমাত্র পরিচয় নয়।
যে সময়ের কোনো হিসাব রাখা হয় না
সেদিন রবিবারে লোকটি অনেকক্ষণ কাজের টেবিলে বসে ছিল। কয়েকটি কাজ শেষ করল, কিছু হিসাব মিলিয়ে নিল, আগামী সপ্তাহের জন্যও কয়েকটি বিষয় লিখে রাখল। তারপরও তার মনে হলো, আরও কিছু করা যেত।
দুপুরের দিকে তার সন্তান এসে পাশে বসল। হাতে কাগজ আর রঙপেনসিল। বাবা কাজ করছেন দেখে প্রথমে কিছু বলল না। নিজের মতো ছবি আঁকতে লাগল।
লোকটি একবার তাকিয়ে আবার কাজে মন দিল। কিছুক্ষণ পর সন্তান ছবিটি তার সামনে এগিয়ে ধরল।
ছবিতে বাবা আর সন্তান পাশাপাশি বসে আছে। বাবার হাতে একটি ঘড়ি আঁকা। গোল ঘড়ির ভেতরে সংখ্যাগুলোও আছে, কিন্তু কাঁটা নেই।
লোকটি ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
সে বুঝতে পারল না, সন্তান ঘড়ির কাঁটা আঁকতে ভুলে গেছে, নাকি ছবিটি এমনই আঁকতে চেয়েছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই তার চোখ আবার ঘড়িটির দিকে চলে গেল।
কাঁটা নেই। সময় বোঝার কোনো উপায় নেই।
অথচ তার নিজের জীবনে সময়ের হিসাবই সবচেয়ে বেশি। কখন কাজ শুরু করবে, কখন শেষ করবে, কতটা এগোল, আর কতটা বাকি—সবকিছুর হিসাব আছে। শুধু হিসাবের বাইরে থেকে যায় সেই সময়টুকু, যখন সন্তানের পাশে বসে থাকা যায়, কোনো কাজের তাড়া থাকে না, কোনো অর্জনের প্রয়োজন হয় না।
সে ছবিটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর কাজের খাতাটি বন্ধ করল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।