টক্সিক প্যারেন্টস — নাকি টক্সিক সন্তান?
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
আমার ফেসবুকের নিউজফিডে গত সপ্তাহে একটা রিল দেখলাম।
একটা মেয়ে ক্যামেরার সামনে কাঁদছে, বলছে—
“আমার মা আমাকে কখনো বোঝেনি। আমি যা চাই তা-ই নিষেধ। এটা টক্সিক।”
কমেন্টে হাজারো লাইক, শেয়ার,
“তোমার মতো আমিও…”।
পরদিন আমার মায়ের ফোন এলো।
“তুই কি খাওয়া-দাওয়া ঠিক করছিস?
রাতে দেরি করে ঘুমাস না।”
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
“মা, আমি ২৮ বছরের ছেলে। ছাড়ো এসব।”
লাইন কেটে দিলাম।
রাতে শুয়ে ভাবলাম—আমি কি ঠিক করলাম?
আমার বাবা কখনো “ভালোবাসি” বলেননি,
তিনি বলতেন, “এই টাকাটা রাখ, কাজে লাগবে।”
আমি তখন ক্লাস নাইনে। টাকা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আইসক্রিম খেয়েছিলাম।
পরে শুনেছি, সেই মাসে তিনি নিজের জন্য একটা শার্ট কেনেননি। আমার বাবা কখনো আমার সঙ্গে বসে “মনের কথা” শেয়ার করেননি।
কিন্তু আমার প্রথম চাকরির ইন্টারভিউর আগের রাতে— দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিলাম, তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন।
চোখ লাল।
আমি তখন বুঝিনি। আজ বুঝি— ওটা ছিল ভয়।
ভয়, যদি আমি ফেইল করি।
আমি কখনো “ধন্যবাদ” বলিনি
আমার মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আমি বাসায় ফিরতাম, প্লেটে খাবার নিয়ে ঘরে চলে যেতাম।
“মা, খাবারটা একটু বেশি নোনতা হয়েছে” — এটুকুই বলতাম।
একদিন মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। আমি রাতে রান্না করতে গিয়ে বুঝলাম— একটা সাধারণ ডাল রান্না করতেও ৪৫ মিনিট লাগে।
আমার মা ৩০ বছর ধরে প্রতিদিন এটা করেছেন।
আমি কখনো “ধন্যবাদ” বলিনি।
আমরা “স্বাধীনতা” চাই, কিন্তু “দায়িত্ব” নিতে ভয় পাই।
আমি যখন বলি, “আমার জীবন, আমার সিদ্ধান্ত”—
তখন আমি ভুলে যাই, আমার বাবা-মা এখনো আমার নামে ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন।
আমার বোনের বিয়ের খরচের জন্য।
আমি জানি না। আমি যখন বলি, “তোমরা আমাকে বোঝো না”— তখন আমি ভুলে যাই,
আমার মা আমার ফেসবুক প্রোফাইল দেখে কাঁদেন। কারণ আমি একটা পোস্টে লিখেছি, “আমার পরিবার আমাকে বোঝে না।”
আমার বন্ধু রাহাতের গল্প বলি, রাহাতের বাবা তাকে ডাক্তার বানাতে চেয়েছিলেন। রাহাত গ্রাফিক ডিজাইনার হয়েছে। বাবা কথা বন্ধ করেছেন।
গত মাসে রাহাতের বাবা হার্ট অ্যাটাক করেছেন।
হাসপাতালে রাহাত গিয়ে দেখল—বাবার পকেটে একটা কাগজ।
তাতে লেখা—
“যদি আমি না থাকি, রাহাতের বিয়ের জন্য ৫ লাখ টাকা আছে।”
রাহাত কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি ভেবেছিলাম বাবা আমাকে বোঝেন না।
আসলে আমিই বুঝিনি।”
বাবা-মা ভুল করেন। আমরাও করি।
আমার বাবা আমাকে তুলনা করতেন পাড়ার রাকিবের সঙ্গে।
আমার মা আমাকে বলতেন, “তুই কখনো কিছু করতে পারবি না।”
এটা আমার কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু আমিও ভুল করেছি।
আমি আমার মাকে বলেছি,
“তুমি আমার জীবন নষ্ট করেছ।”
আমি জানি না, সেই কথা শুনে মা কত রাত ঘুমাননি।
সমাধান কী?
আমি আর আমার মা এখন প্রতি রবিবার এক কাপ চা খাই। কোনো ফোন নয়। কোনো টিভি নয়।
শুধু দুজনে।
আমি বলি,
“মা, তুমি কেমন আছ?”
মা বলেন,
“তুই খাওয়া-দাওয়া করছিস তো?”
একদিন মা বললেন,
“আমি জানি না কীভাবে ভালোবাসা দেখাতে হয়।
আমার মা-বাবাও তো বলেননি।
কিন্তু আমি তো চেষ্টা করেছি।”
আমি মায়ের হাত ধরে বললাম,
“আমিও চেষ্টা করছি।”
শেষ কথা
টক্সিক প্যারেন্টস নেই আবার টক্সিক সন্তানও নেই।
আছে শুধু—
দুটো প্রজন্ম।
একটা যারা কষ্ট লুকিয়ে ভালোবাসতে শিখেছে।
আরেকটা যারা কষ্ট দেখিয়ে ভালোবাসতে শিখছে।
যেদিন আমরা একে অপরের ভাষা শিখব,
সেদিন আর “টক্সিক” থাকবে না।
থাকবে শুধু— পরিবার।
#পরিবার #ভালোবাসারভাষা #প্রজন্মেরগল্প
#মা #বাবা #বোঝাপড়া
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।