মায়ের ছায়া
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গ্রামে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, “যে মেয়ের মা যত বেশি চালাক, সেই মেয়ের তত বেশি তালাক।”
কথাটা শুনলে আপত্তি হওয়াই স্বাভাবিক। একটি মেয়ের সংসার ভেঙে যাওয়ার দায় তার মায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। দাম্পত্য ভাঙার পেছনে স্বামী-স্ত্রীর আচরণ, অর্থনৈতিক চাপ, অবিশ্বাস, নির্যাতন, আসক্তি কিংবা মানসিকতার অমিল—অনেক কারণ থাকতে পারে।
তবু কথাটাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও কঠিন। কারণ আমাদের আশপাশে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেখানে মায়ের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ মেয়ের সংসারের ছোট সমস্যাকে বড় করে তোলে।
মেয়ের বিয়ের পরও অনেক মা তাকে আগের মতো আগলে রাখতে চান। মেয়ে কী রান্না করল, শাশুড়ি কী বলল, স্বামী কখন বাড়ি ফিরল, কেন ফোন করল না, মাসে কত টাকা দিল—সংসারের ছোট-বড় অনেক খবরই নিয়মিত মায়ের কাছে যায়।
মায়ের কাছে এগুলো খোঁজখবর।
কিন্তু খোঁজখবর আর হস্তক্ষেপের মাঝখানে একটা সীমারেখা আছে। সেই সীমাটা কখন পেরিয়ে যাচ্ছে, অনেক সময় মা নিজেও বুঝতে পারেন না।
ধরা যাক, এক রাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হলো। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে মাকে ফোন করল।
মা বললেন,
“তুই আর সেখানে থাকবি না। এখনই চলে আয়।”
মেয়েটি হয়তো কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পারত। ঝগড়াটা সেখানেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু মায়ের কথায় সে রাতেই বাবার বাড়ি চলে গেল।
পরদিন দুই পরিবার বসে গেল।
মেয়ের পরিবার বলল, “মেয়েকে আর পাঠাব না।”
ছেলের পরিবার বলল, “তাহলে আমরাও রাখব না।”
গত রাতের ঝগড়াটা এর মধ্যে দুই পরিবারের মান-অভিমানের বিষয় হয়ে গেল। কে কাকে অপমান করেছে, কে আগে ক্ষমা চাইবে, কে মেয়েকে নিতে যাবে—এসব হিসাব শুরু হলো।
যে সমস্যা স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নিতে পারত, সেটাই তখন দুই পরিবারের সমস্যায় পরিণত হলো।
বিয়ের পর একটি মেয়ের নতুন সংসার তৈরি হয়। সেখানে তাকে নিজের মতো করে চলতে হবে, ভুল করতে হবে, ভুল থেকে শিখতে হবে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত যদি মায়ের কাছ থেকে আসে, তাহলে মেয়েটি নিজের সংসারের মানুষ হয়ে উঠবে কীভাবে?
কিছু মা মেয়ের ভালো চান বলেই বেশি সতর্ক থাকেন। ভয় পান, মেয়ে কষ্ট পাচ্ছে কি না, কেউ তাকে ঠকাচ্ছে কি না। এই ভয় স্বাভাবিক।
সমস্যা শুরু হয় যখন সেই ভয় নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়।
মেয়ের স্বামীকে পছন্দ হলো না।
“ওকে বদলে ফেল।”
শ্বশুরবাড়িতে মনোমালিন্য হলো।
“তুই কেন সহ্য করবি?”
স্বামী সংসারের খরচ কম দিল।
“তোর বাবার বাড়িতে কি তোকে এভাবে থাকতে হয়েছে?”
মায়ের কথায় মমতা থাকতে পারে। কিন্তু দিনের পর দিন এসব শুনতে শুনতে মেয়েটির মনে নিজের সংসার সম্পর্কে তুলনা তৈরি হয়। কে তার কথা রাখল, কে রাখল না, কে তাকে বেশি গুরুত্ব দিল—সংসার তখন ভালোবাসার জায়গা থেকে ধীরে ধীরে হিসাবের জায়গায় চলে যেতে পারে।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। স্বামী যদি স্ত্রীকে মারধর করেন, অপমান করেন, প্রতারণা করেন, ভরণপোষণ না দেন কিংবা নিয়মিত মানসিক নির্যাতন করেন, তাহলে মেয়েকে চুপ করে থাকতে বলা অন্যায়। সেখানে মায়ের দায়িত্ব মেয়ের পাশে দাঁড়ানো।
মেয়েকে বিপদ থেকে রক্ষা করা আর মেয়ের সংসারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজের হাতে নেওয়া এক কথা নয়।
একই কথা ছেলের মা-বাবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ছেলে বিয়ের পর প্রতিদিন মায়ের কাছে ফোন করে বলছে, “আজ বউ এটা বলেছে, ওটা করেনি।”
মা বলছেন, “বউকে এত টাকা দিস না।”
কখনো বলেন, “আজ কী রান্না করেছে?”
কখনো বলেন, “তোর বউকে একটু শাসনে রাখ।”
এভাবেও একটি নতুন সংসারের ভেতরে বাইরে থেকে নিয়ম তৈরি হতে থাকে। ছেলের মা যদি প্রতিটি বিষয়ে মত দেন, আর ছেলে সেই মতকে স্ত্রীর ওপর প্রয়োগ করতে থাকে, তাহলে মেয়েটির কাছে সেই সংসার আর নিজের সংসার মনে হয় না।
নতুন সংসারে দুজন মানুষের কিছু ভুল, কিছু অভিমান, কিছু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের জায়গা থাকা দরকার। বাবা-মায়ের ভালোবাসা সেখানে থাকবে, কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তের মালিকানা থাকবে না।
মেয়ে বিপদে পড়লে মায়ের কাছেই আগে ছুটে যায়। তাই মায়ের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
মেয়ে ফোন করলে আগে শুনতে হবে। রাগের মাথায় বলা কথা আর দীর্ঘদিনের নির্যাতনের কথা এক নয়।
কখনো বলতে হবে, “আজ কোনো সিদ্ধান্ত নিস না। আগে শান্ত হয়ে কথা বল।”
আবার সত্যিই অন্যায় হলে বলতে হবে, “চুপ করে থাকিস না। আমি আছি।”
এই “আমি আছি” কথাটার মূল্য অনেক।
মেয়ের হয়ে জীবন চালানো নয়, প্রয়োজনের সময় তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো শক্ত করে তোলাই মায়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
মা পাশে থাকবেন। বাবা-মাও পাশে থাকবেন। কিন্তু নতুন সংসারের জায়গাটা নতুন দম্পতিকেই দিতে হবে।
কারণ মেয়েকে আগলে রাখা আর মেয়ের হয়ে বেঁচে থাকা—দুটো এক জিনিস নয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।