চলে গিয়েও থেকে যাওয়া
(জীবন, কর্ম ও মানবিক সম্পর্ক)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৩ অক্টোবর ২০২৬
লোকটা মারা যাওয়ার পর তাঁর বাড়িতে অনেক মানুষ এসেছিল। কেউ আত্মীয়, কেউ প্রতিবেশী, কেউ বহুদিনের পরিচিত। সবাই তাঁর কথা বলছিলেন। কেউ বললেন, মানুষটা ভালো ছিলেন। কেউ বললেন, বিপদে পড়লে তাঁকে ডাকলে খালি হাতে ফিরতে হতো না। ভিড়ের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধটি কিছু বলছিলেন না। তাঁর চোখ ভিজে উঠেছিল। বহু বছর আগে নিজের কঠিন সময়ে এই মানুষটিই তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, অথচ কখনো সেই সাহায্যের কথা কাউকে জানতে দেননি।
মৃত মানুষটির সম্পদ একদিন ভাগ হয়ে যাবে। ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলা হবে, আলমারির পোশাকগুলোও হয়তো আর কেউ ব্যবহার করবে না। কিন্তু বৃদ্ধের মনে যে মানুষটি বেঁচে আছেন, তাঁকে মুছে ফেলার কোনো উপায় নেই।
জন্মের মুহূর্তটি মানুষের নিজের হাতে থাকে না। মৃত্যুর সময়ও সে নিশ্চিতভাবে জানে না। মাঝখানের সময়টুকুতে সে কত সম্পদ জমাল, কত ক্ষমতা অর্জন করল, কত মানুষকে নিজের অধীনে রাখল—এসবের হিসাব একদিন বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত মানুষের মনে তার জন্য কী রয়ে গেল, সেই প্রশ্নটাই বড় হয়ে ওঠে।
পাড়ার মোড়ে এক দোকানদার আছেন। পরিচিত কেউ মাসের শেষে টাকা দিতে না পারলে তিনি খাতায় বাকি লিখে রাখেন। দু-একবার মনে করিয়ে দেন, তারপর আর তাগাদা দেন না। একদিন তাঁর নিজের দোকান বন্ধ ছিল। সেদিন কয়েকজন ক্রেতা খোঁজ নিতে এসেছিলেন। তাঁদের একজন বলেছিলেন, “লোকটা শুধু জিনিস বিক্রি করত না, মানুষের অসুবিধাটাও বুঝত।” কথাটা হয়তো কোনোদিন খবরের কাগজে ছাপা হবে না। কিন্তু যারা তাঁর কাছ থেকে এমন ব্যবহার পেয়েছেন, তাঁদের মনে কথাটা থেকে যাবে।
মানুষের মনে জায়গা করে নিতে সব সময় বড় কিছু করতে হয় না। কখনো সময়মতো বলা একটা কথা, কখনো বিপদের দিনে পাশে বসে থাকা, কখনো অপমানিত একজন মানুষের সম্মানটুকু ফিরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট।
অথচ কাছের মানুষ বেঁচে থাকতে আমরা অনেক সময় তাঁর অবদানকে স্বাভাবিক ধরে নিই। মা প্রতিদিন খাবার তুলে দেন, বাবা নিজের অসুবিধা গোপন করে সন্তানের প্রয়োজন মেটান, বন্ধু বিপদে ফোন ধরেন—এসব যেন তাঁদের কর্তব্য, এর বেশি কিছু নয়। তাঁরা চলে গেলে তখন ছোট ছোট কাজগুলোর অর্থ বদলে যায়। যে ফোনকল একসময় বিরক্তির কারণ ছিল, সেই নম্বরের দিকে তাকিয়ে মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তবে কাউকে মনে রাখার অর্থ তাঁর সব ভুল মুছে ফেলা নয়। মানুষ ভালো কাজের পাশাপাশি অন্যায়ও করতে পারে। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁর ভুলের সমালোচনা করা—দুটোই সম্ভব। সত্যকে আড়াল করে কাউকে মহান বানানোর চেয়ে তাঁর কাজের ন্যায্য মূল্যায়ন করাই জরুরি।
ভালো কাজ করলেই সবাই ভালোবাসবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। কেউ উপকার পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন না। কেউ ভালো আচরণকে দুর্বলতা মনে করেন। তাই মানুষের প্রশংসা পাওয়াকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানালে নিজের বিবেকের সঙ্গে আপস করার ঝুঁকি থাকে।
ভালো কাজের অর্থ সবার মন জয় করা নয়। বরং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্যায় না করা, নিজের লাভের জন্য কাউকে ঠকিয়ে না দেওয়া এবং অন্যের অসহায়ত্বকে ব্যবহার না করাই অনেক সময় বড় পরিচয় হয়ে ওঠে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, জীবনে বড় কিছু করতে পারলে মানুষ আমাদের মনে রাখবে। অথচ বিখ্যাত হওয়া জরুরি নয়। পরিবারের একজন নির্ভরযোগ্য মানুষ, পাড়ার একজন সৎ প্রতিবেশী কিংবা বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষও অন্যের জীবনে গভীর ছাপ রেখে যেতে পারেন।
জন্মের সময় মানুষ কিছু সঙ্গে নিয়ে আসে না। মৃত্যুর সময়ও নিজের অর্জিত সবকিছু সঙ্গে নিতে পারে না। তবু তার চলে যাওয়া কারও জীবনে শূন্যতা তৈরি করে। কারণ সম্পদ রেখে যাওয়া আর কারও জীবনে মূল্যবান হয়ে থাকা এক বিষয় নয়।
হয়তো মৃত্যুর পর আমাদের নাম কত দিন বেঁচে থাকবে, তা আমরা জানতে পারব না। কে মনে রাখবে, কে ভুলে যাবে, সেটাও আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু আজ কারও সঙ্গে কেমন আচরণ করব, অসহায় কাউকে ফিরিয়ে দেব কি না, নিজের সুবিধার জন্য অন্যের ক্ষতি করব কি না—এসব সিদ্ধান্ত এখনো আমাদের হাতে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।