সম্মানের দাম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ২২ আগস্ট ২০২৬
“গরিবের কাছে টাকা না থাকা কষ্টের, ধনীর কাছে টাকা হারানো কষ্টের; কিন্তু মধ্যবিত্তের কাছে মান-সম্মান হারানো অনেক সময় তার চেয়েও ভয়ংকর।”
মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো তার ব্যাংক ব্যালান্স নয়। বাড়ি, গাড়ি, জমি বা সঞ্চয়ও নয়।
তার সবচেয়ে বড় সম্পদ একটা সামাজিক পরিচয়,সে ভালো আছে।
সংসারে টানাটানি থাকলেও বাইরে থেকে যেন বোঝা না যায়। বাজারের দাম বাড়লেও পোশাকটা যেন খুব সাধারণ না হয়। সন্তানের স্কুলটা যেন আত্মীয়ের সন্তানের চেয়ে পিছিয়ে না থাকে। কোনো অনুষ্ঠানে গেলে যেন বোঝা না যায়, গত কয়েক মাস ধরে সংসারের হিসাব ঠিকমতো মিলছে না।
এই “ভালো থাকার” একটা অদৃশ্য খরচ আছে।
আর মধ্যবিত্ত মানুষ অনেক সময় সেই খরচটাই সবচেয়ে বেশি দেয়।
কারণ সে শুধু গরিব হতে ভয় পায় না; গরিব দেখাতেও ভয় পায়।
একজন মানুষের আয় কমে গেছে। কয়েক মাস ধরে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। সঞ্চয় প্রায় শেষ। তবু আত্মীয়কে বলা যাচ্ছে না।
“কিছুদিন একটু টানাটানি যাচ্ছে”—এই কথাটুকুও বলতে তার সংকোচ হয়।
কারণ সাহায্য চাওয়া মানে যেন নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করা।
অথচ একই মানুষটি হয়তো অন্য কাউকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের শেষ সঞ্চয়টুকুও দিয়ে দিয়েছেন।
কেন?
কারণ সাহায্য নেওয়ার চেয়ে সাহায্য করতে পারাটা তার কাছে সম্মানের।
এটাই মধ্যবিত্ত জীবনের এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব।
যে খরচের কোনো বিল আসে না
মধ্যবিত্তের অনেক খরচের কোনো রসিদ থাকে না।
আত্মীয়ের বিয়ে আছে। ভালো পোশাক দরকার। উপহার দিতে হবে। সন্তানের জন্মদিনে কিছু একটা আয়োজন করতে হবে। ঈদে নতুন জামা না দিলে সন্তান কষ্ট পাবে—তার চেয়েও বড় ভয়, অন্যরা কী ভাববে।
কেউ হয়তো সত্যিই কিছু বলবে না।
তবু মাথার ভেতর একটা বাক্য ঘুরতে থাকে,
“মানুষ কী বলবে?”
এই চারটি শব্দের কোনো বাজারদর নেই। কিন্তু এর জন্য মানুষ সঞ্চয় ভাঙে, ধার করে, ক্রেডিট কার্ডের বিল জমায়, এমনকি প্রয়োজনের খরচও পিছিয়ে দেয়।
অর্থাৎ অনেক সময় আমরা প্রয়োজন মেটাতে টাকা খরচ করি না।
আমরা নিজের সামাজিক অবস্থানটাকে টিকিয়ে রাখতে টাকা খরচ করি।
সন্তানের স্কুলও সামাজিক পরিচয় হয়ে ওঠে
সন্তানের জন্য ভালো শিক্ষা চাইবে—এটা স্বাভাবিক।
কিন্তু কখনো কখনো শিক্ষার প্রয়োজনের সঙ্গে সামাজিক প্রতিযোগিতা মিশে যায়।
“ওর ছেলে ওই স্কুলে পড়ে।”
“ওর মেয়ে ইংরেজি মাধ্যমে।”
“আমার সন্তানকে কম কোথায় পড়াব?”
তারপর শুরু হয় এমন এক প্রতিযোগিতা, যার কোনো শেষ নেই।
স্কুলের ফি, কোচিং, বই, পোশাক, যাতায়াত—সব মিলিয়ে পরিবারের আয়ের বড় একটা অংশ চলে যায়। সন্তানের প্রয়োজনের সঙ্গে তখন মিশে যায় অন্যের চোখে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চাপ।
কিন্তু প্রশ্নটা খুব কম মানুষই করেন,
আমি সন্তানের প্রয়োজন মেটাচ্ছি, নাকি নিজের সামাজিক মর্যাদা?
ধার করে সম্মান কেনা যায়?
একটা বিয়ের অনুষ্ঠান।
একটা পারিবারিক আয়োজন।
বাজেটের বাইরে চলে গেছে।
তবু অনুষ্ঠান ছোট করা যাবে না।
কারণ আত্মীয়রা কী ভাববে?
ফলে ধার করা হয়।
অনুষ্ঠান শেষ হয়। ছবি ওঠে। অতিথিরা চলে যায়। কয়েক দিন পর কে কত খরচ করেছিল, সেটাও হয়তো কারও মনে থাকে না।
কিন্তু ধারটা থেকে যায়।
মাসের পর মাস।
কখনো বছরের পর বছর।
যে সম্মান রক্ষা করতে টাকা ধার নেওয়া হয়েছিল, সেই সম্মানের কথা মানুষ ভুলে যায়; কিন্তু ঋণের কিস্তি ভুলে যায় না।
সাহায্য চাইতে এত লজ্জা কেন?
মধ্যবিত্ত মানুষের গভীর সংকটগুলোর একটি হলো,
সে অনেক সময় ভেঙে পড়ার পরও সাহায্য চাইতে পারে না।
চিকিৎসার টাকা জোগাড় হচ্ছে না।
চাকরি চলে গেছে।
ব্যবসায় লোকসান হয়েছে।
সন্তানের পড়াশোনার খরচ সামলানো কঠিন।
তবু মুখে বলে,
“চলছে।”
এই “চলছে” শব্দটির ভেতরে কত রাতের অস্থিরতা থাকে, বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
কারণ ভয় হয়—মানুষ জানলে কী ভাববে?
হয়তো এখানেই মধ্যবিত্তের সম্মান কখনো কখনো নিরাপত্তার বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
মানুষ আমাদের জীবন চালায় না। তারা কিছুক্ষণ দেখে, মন্তব্য করে, তারপর নিজেদের জীবনে ফিরে যায়।
কিন্তু তাদের মন্তব্যের ভয় পেয়ে নেওয়া ঋণ, করা অতিরিক্ত খরচ কিংবা হারিয়ে ফেলা মানসিক শান্তি, সেগুলো আমাদেরই বহন করতে হয়।
জীবনে টান পড়তে পারে। ব্যবসায় লোকসান হতে পারে। চাকরি চলে যেতে পারে। অসুস্থতা আসতে পারে।
এসবের কোনোটাই মানুষকে ছোট করে না।
তবু আমরা কত কিছু লুকিয়ে রাখি—শুধু যেন বাইরে থেকে মনে হয়, সব ঠিক আছে।
হয়তো সম্মানেরও একটা সীমা থাকা দরকার।
কারণ যে সম্মানের জন্য নিজের ঘরের শান্তি বন্ধক রাখতে হয়, তার দাম কি সত্যিই এত বেশি?
“মানুষ কী বলবে”—এই একটি বাক্য আপনার জীবনে কতগুলো সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।