দান: পুণ্যের হিসাবের বাইরে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী।১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মসজিদের গেটের পাশে মানুষটি বসে ছিল। হাতে একটি প্লাস্টিকের বাটি। সামনে দিয়ে লোকজন ঢুকছে, বের হচ্ছে। কেউ কয়েক টাকা দিচ্ছে, কেউ চোখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে। লোকটির মুখে কোনো অভিযোগ নেই। শুধু বসে থাকা।
দৃশ্যটি আমাদের খুব পরিচিত। এতটাই পরিচিত যে অনেক সময় আমরা আর তাকাইও না।
কিন্তু দানের কথা ভাবতে গেলে এই মানুষটির মুখ দিয়েই শুরু করা দরকার। কারণ দান শুধু দাতার বিষয় নয়। যার কাছে দান পৌঁছায়, তারও একটি জীবন আছে, একটি পরিচয় আছে, একটি মর্যাদা আছে।
বিভিন্ন ধর্মে দানকে তাই শুধু অর্থ দেওয়ার কাজ হিসেবে দেখা হয়নি। বরং দানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে মানুষের প্রতি দায়িত্ব, নিয়ত, ন্যায়, বিনয় এবং নিজের ভেতরের লোভকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা।
ইসলামে দান একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। জাকাত বাধ্যতামূলক আর সদকা স্বেচ্ছামূলক হলেও দুটির ভেতরেই একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—নিয়ত। সূরা আল-বাকারা ২৬৪ নম্বর আয়াতে দান করে পরে খোঁটা দেওয়া, কষ্ট দেওয়া কিংবা লোক দেখানো থেকে সতর্ক করা হয়েছে। অর্থাৎ টাকা দেওয়া হলো, কিন্তু দেওয়ার পর মানুষটিকে অপমান করা হলো—এমন দান ধর্মীয় দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় থাকে না।
খ্রিস্টধর্মেও দানের সঙ্গে গোপনীয়তা ও বিনয়ের সম্পর্ক আছে। মথি রচিত সুসমাচারে যিশু এমনভাবে দান করার কথা বলেছেন, যাতে দানের প্রচার নিজের মহত্ত্ব প্রদর্শনের উপায় না হয়ে ওঠে। এখানে প্রশ্নটা শুধু কত দিলাম, তা নয়। কেন দিলাম, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ইহুদি ধর্মের ‘তজেদাকা’ ধারণাটিও বেশ আলাদা। আধুনিক অর্থে যাকে আমরা দয়া বা দান বলি, তজেদাকার মধ্যে তার চেয়ে বেশি কিছু আছে। এর সঙ্গে ন্যায় ও দায়িত্বের ধারণা জড়িত। অর্থাৎ যার প্রয়োজন আছে, তাকে সাহায্য করা শুধু ভালো মনের পরিচয় নয়; সমাজের প্রতি একটি নৈতিক দায়িত্বও।
সনাতন ধর্মেও দানের গুরুত্ব গভীর। ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ে দানকে বিভিন্ন ধরনের বলা হয়েছে। সেখানে ‘সাত্ত্বিক দান’ বলতে এমন দানের কথা বলা হয়েছে, যা কর্তব্যবোধ থেকে করা হয়, বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা থাকে না এবং উপযুক্ত সময়, স্থান ও ব্যক্তির কথা বিবেচনা করা হয়। সহজ ভাষায়, দান শুধু হাত খোলার বিষয় নয়; মনটাও ঠিক থাকা দরকার।
বৌদ্ধধর্মে ‘দান’ মানুষের লোভ ও আসক্তি কমানোর একটি অনুশীলন। কিছু ছেড়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের ‘আমার’ ভাবটাকেও একটু একটু করে অতিক্রম করতে শেখে।
ধর্মগুলো আলাদা। তাদের ভাষা ও ব্যাখ্যাও আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় আশ্চর্য মিল আছে—দান যেন দাতার অহংকার বাড়ানোর উপায় না হয়।
আমাদের সমাজে এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ভাবার।
আজকাল দানের ছবি তোলা হয়। ফেসবুকে দেওয়া হয়। কোনো কোনো অনুষ্ঠানে অসহায় মানুষের হাতে টাকা বা খাবার তুলে দেওয়ার ছবি ছড়িয়ে পড়ে। সব ছবি অবশ্যই খারাপ নয়। কোনো উদ্যোগ সম্পর্কে মানুষকে জানানো দরকার হতে পারে। অন্যদের উৎসাহিত করাও প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন অসহায়ত্বটাই প্রচারের উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়।
দাতার পরিচয় বড় হয়ে ওঠে। আর গ্রহণকারীর পরিচয় শুধু ‘অসহায়’ হয়ে যায়।
যে মানুষটি হয়তো সারা জীবন নিজের মতো করে সংসার চালিয়েছে, আজ বিপদে পড়ে সাহায্য চাইছে—তার সেই সাময়িক দুর্বলতাকে কি আমাদের প্রচারের অংশ বানানো উচিত?
প্রশ্নটি সহজ। উত্তরটি কঠিন।
কারণ দান মানেই সব সময় টাকা নয়। কারও চিকিৎসার খরচ দেওয়া দান হতে পারে। কারও চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া দান হতে পারে। একজন তরুণকে একটি দক্ষতা শেখানোও দান। কারও কথা মন দিয়ে শোনার জন্য এক ঘণ্টা সময় দেওয়াও এক ধরনের মানবিকতা।
আবার সব দানও সমান প্রয়োজনীয় নয়।
যার খাবার দরকার, তাকে বক্তৃতা দিয়ে লাভ নেই। যার চিকিৎসা দরকার, তাকে শুধু সান্ত্বনা দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না। যার কাজ দরকার, তাকে বারবার সাহায্যের টাকা দিয়ে যাওয়ার চেয়ে একটি কাজের সুযোগ করে দেওয়া হয়তো অনেক বড় সহায়তা।
মানুষের প্রয়োজন কোনো উৎসবের তারিখ মেনে আসে না। ক্ষুধা, অসুখ, বেকারত্ব কিংবা ঋণের চাপ কোনো বিশেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করে না।
তাই দানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো ‘কত দিলাম’ নয়।
বরং, ‘যাকে দিলাম, তাকে কীভাবে দিলাম?’
তার কষ্টকে কি নিজের মহত্ত্ব দেখানোর কাজে ব্যবহার করলাম?
নাকি এমনভাবে পাশে দাঁড়ালাম, যাতে সাহায্য পাওয়ার পরও মানুষটি নিজের মর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?
ভাষা আলাদা, পথ আলাদা, কিন্তু মানুষের মুখটি একই।
সেখানেই দানের আসল অর্থ।
দান শুধু পুণ্য অর্জনের হিসাব নয়। দান হলো, নিজের সামর্থ্য দিয়ে আরেকজন মানুষের জীবনটাকে একটু কম কঠিন করে দেওয়া।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।