ভয়ের কক্ষে বন্ধু
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০২৬
ভয় যা বোঝানো যায় না।
জয়পুরহাটের একটি ছোট সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। বিকেলের রোদ বাইরে ঝলমল করছে, কিন্তু পরীক্ষা কক্ষের ভেতর অন্ধকার নেমে এসেছে—একটা ছোট্ট শিশুর চোখে।
৭ বছর বয়সী আরিফ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। জ্বর, মাথাব্যথা, বমি—শারীরিক লক্ষণগুলো ডাক্তারের কাছে পরিচিত। কিন্তু আরিফের চোখে যা দেখা যাচ্ছে, তা শুধু অসুস্থতা নয়—ভয়ের ছাপ। গভীর, নীরব, অসহায়।
ডাক্তার বললেন,
“সিটি স্ক্যান করতে হবে। মাথায় কোনো সমস্যা আছে কি না নিশ্চিত করতে হবে।”
শিশুর কাছে এটা কোনো সাধারণ পরীক্ষা নয়। এটা একটা অজানা, অন্ধকার, গর্জন করা যন্ত্রের মুখে একা ঢোকার ভয়। নিয়ম অনুযায়ী কেউ ভেতরে যেতে পারবে না। বাবা-মা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন। নার্সরা আশ্বাস দেবেন—“ভয় পেয়ো না, আমরা ঠিক বাইরে আছি।” কিন্তু “বাইরে থাকা” আর “পাশে থাকা” এক নয়।
“ব্যথা হবে না, মাত্র ৫ মিনিট।”
ডাক্তাররা বোঝালেন। যুক্তি দিলেন। কিন্তু আরিফের কাছে সেই ৫ মিনিট মানে চিরকালের একাকিত্ব। ছোট্ট হাত মায়ের আঁচল শক্ত করে ধরে রেখেছে। কান্না থামছে না। দুই ঘণ্টা পার হয়েছে। মানবিক লজিক হার মানছে শিশুর ভয়ের কাছে। মায়ের শান্তি, বাবার বোঝানো—সব ব্যর্থ।
এটি ছিল মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন ভয়: একাকিত্ব।
সব চেষ্টা ব্যর্থ। আরিফ কাঁদছে। তখন একজন নার্সের মাথায় ভাবনা এল: “ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে ডাকুন। হতে পারে সঙ্গ পেলে ভয় কমবে।”
ফোন করা হলো রিয়াদকে—আরিফের ক্লাসমেট। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে সে হাসপাতালে পৌঁছে গেল। রিয়াদ এসেছিল কোনো ডাক্তারি পরামর্শ নিয়ে নয়, মেশিন সম্পর্কে কিছু জানতও না। সে এসেছিল শুধু একটা বার্তা দিতে: “তুই একা নস। আমি আছি।”
রিয়াদ ঢুকতেই আরিফের কান্না থেমে গেল। চোখ খুলে তাকাল—“রিয়াদ?”
রিয়াদ কোনো যুক্তি দিল না, কোনো বড় কথা বলল না। শুধু পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “চল, আমি তোর সঙ্গে থাকব।”
ডাক্তার শর্ত দিলেন—দরজার কাছে দাঁড়াবে, খুব কাছে নয়। আরিফ টেবিলে শুয়ে পড়ল। মেশিন চালু হলো। গুনগুন শব্দ শুরু।
রিয়াদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আরিফের পা ধরল।
৩ ঘণ্টার কান্না শেষ। মাত্র ৩ সেকেন্ডে। ভয় কমল, একাকিত্ব হারল।
ভয় মানুষের স্বাভাবিক। তবে একা থাকলে তা দ্বিগুণ হয়। রিয়াদ কেবল পাশে দাঁড়ালেই ভয় ভাগ হয়ে গেল।
এটি জাদু নয়, চিকিৎসা নয়। এটি মানবিক উপস্থিতির শক্তি। বন্ধুত্ব মানে—ভয়ের সময় পাশে থাকা।
আজকের ডিজিটাল যুগে ‘সাপোর্ট’ মানে লাইক, কমেন্ট, চ্যাট। কিন্তু প্রকৃত শক্তি আসে স্পর্শ থেকে, দেখা থেকে, নীরব সঙ্গ থেকে। লজিক শক্তিশালী, কিন্তু এমপ্যাথি শক্তিশালীতম। বোঝানো মানে শোনানো নয়; পাশে থাকা প্রয়োজন।
বন্ধু কখনো নায়ক নয়—সে শুধু আসে। মানুষ ভয়মুক্ত হতে চায় না, সে চায় সঙ্গ।
আরিফ বলেছিল, “বন্ধুকে সঙ্গে নিতে হবে”—সরল, কিন্তু গভীর। সে বলছিল: “আমাকে একা রাখো না।”
আপনার জীবনের ‘রিয়াদ’-কে খুঁজুন।
আমরা সবাই কখনো না কখনো ভয়ের কক্ষে দাঁড়াই। চাকরির চাপ, অসুস্থতা, সম্পর্কের ভয়, আর্থিক সংকট—প্রত্যেকের জীবনে এমন মুহূর্ত আসে।
আজই সেই বন্ধু বা সহকর্মীকে জানান:
“তুমি আমার ভয়ের সময় পাশে ছিলে। ধন্যবাদ।”
ভয় আসে, কিন্তু একা থাকতে হবে না।
বন্ধু মানে—ভয়ের কক্ষে পাশে দাঁড়ানো।
#ভয়ের_কক্ষে_বন্ধু #সত্যিকারের_বন্ধুত্ব #মানবিকতার_গল্প #একা_নও_তুমি #ভাইরাল_সত্যি_গল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।