যখন একটা হৃদয় আর লড়তে পারে না
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১২ ডিসেম্বর ২০২৫
গত ৪ ডিসেম্বর রাত আড়াইটা।
আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু রাকিব ফোন করে কাঁপা গলায় বলল,“ভাই, বুকটা যেন কেউ চেপে ধরে রেখেছে। ঘাম হচ্ছে, হাত-পা ঠান্ডা। আমি আর পারছি না।”
আমি বুঝলাম, হার্ট অ্যাটাক। আমরা দুজনেই ছুটলাম জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। দেশের একমাত্র বিশেষায়িত হৃদরোগ হাসপাতাল। ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে বলে শুনেছি। কিন্তু সেই রাতে বুঝলাম, খোলা থাকা আর জীবন বাঁচানো এক জিনিস নয়।
গেটের সামনে পৌঁছতেই দেখি, ইমার্জেন্সির দরজা আধখোলা। ভিতরে লম্বা লাইন। গার্ড আর নার্সরা বলল,
“CCU-তে একটাও বেড খালি নেই। ICU-তে নেই। কার্ডিয়াক ক্যাথ ল্যাবে লাইন। রোগী রাখার জায়গা নেই। বাইরে বসান।”
আমি চিৎকার করে বললাম,
“ও মরে যাবে! গোল্ডেন আওয়ার যাচ্ছে!”
একজন ডাক্তার বেরিয়ে এসে ক্লান্ত গলায় বললেন,
“আমরা জানি। গতকাল থেকে ২২ জন রোগী এসেছে, CCU-তে বেড আছে মাত্র ১২টা। বাকিরা ফ্লোরে শুয়ে আছে। কয়েকজন তো পথেই মারা গেছে। প্রাইভেটে নিয়ে যান।”
দেশের জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে রাতের বেলা রোগী ফ্লোরে শোয়!
যে হাসপাতালে বছরে ৫০ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হয়, সেখানে CCU-র বেড মুখে আঙুলে গোনা যায়। ক্যাথ ল্যাব আছে মাত্র দুটো, যার একটা প্রায়ই খারাপ থাকে। এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটা ৪৫ বছর ধরে চলা রাষ্ট্রীয় অবহেলার ফল। ১৯৭৮ সালে যখন এই হাসপাতাল চালু হয়েছিল, তখনকার বেড আর যন্ত্রপাতি আজও বাড়েনি। জনসংখ্যা বেড়েছে তিনগুণ, হৃদরোগ বেড়েছে দশগুণ, কিন্তু বেড বেড়েছে শূন্য।
রাকিবের বয়স ৪৫। দুটো বাচ্চার বাবা। কখনো ধূমপান করেনি। রোজ সকালে হাঁটত। চাকরি করত। বাচ্চাদের স্কুলের ফি জমাতে রাত জেগে ওভারটাইম করত। কিন্তু সেই রাতে ওর হাত আমার হাতের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে আসছিল। আমি ওকে কোলে তুলে বললাম, “লড় রাকিব, আর একটু। তোর বাচ্চারা তোকে দরকার।” কিন্তু ওর চোখ বন্ধ হয়ে গেল। ওর শেষ কথা ছিল, “ভাই, আমার মেয়েটার জন্য একটা বাবা রেখে যেতে পারলাম না।”
প্রাইভেট হাসপাতালে ছুটলাম। পথে অ্যাম্বুলেন্স পেলাম না। ট্যাক্সিতেই নিয়ে যেতে হলো। প্রথম হাসপাতালে শুনলাম, “ক্যাথ ল্যাব বুকড।”
দ্বিতীয়টায়, “অগ্রিম দুই লাখ।” আমার কাছে ছিল মাত্র পনেরো হাজার। ফোন করলাম সবাইকে। রাতের অন্ধকারে কেউ টাকা জোগাড় করতে পারল না।
তৃতীয় হাসপাতালে গিয়ে দেখি, আরো ছয়জন হার্ট অ্যাটাকের রোগী লাইনে। একজনের পরিবার কাঁদছে, “টাকা নেই। বেড নেই। আমার স্বামী মরে যাবে।” আরেকজনের বাবা ফ্লোরে শুয়ে আছে, অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া।
ভোর সাড়ে পাঁচটায় একটা হাসপাতালে ঢুকতে পারলাম। ডাক্তার বললেন, “খুব দেরি হয়ে গেছে। হার্টের ৮৫% ড্যামেজ।” তবু চেষ্টা করলেন। কিন্তু সকাল সাড়ে সাতটায় রাকিব আর ফিরল না।
ওর স্ত্রী এসে আমার কাছে জিজ্ঞেস করল,
“আমার স্বামী কোথায়?”
আমি কিছু বলতে পারিনি। শুধু ওর দুটো বাচ্চার দিকে তাকিয়ে কাঁদলাম।
মেয়েটা জিজ্ঞেস করল, “বাবা কবে আসবে?”
আমি শুধু ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম।
একজন মানুষ মারা গেল। শুধু এই কারণে যে,
- জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে বেড ছিল না।
- ক্যাথ ল্যাবে লাইন ছিল।
- প্রাইভেটে টাকা ছিল না।
- আর রাষ্ট্র কখনো স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেয়নি।
এই দেশে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট জিডিপির ০.৯%। ভারতে ২.১%, শ্রীলঙ্কায় ১.৭%, এমনকি নেপালেও ১.৩%।
আমরা পদ্মা সেতু বানাই, মেট্রোরেল বানাই, ফ্লাইওভার বানাই, কিন্তু হাসপাতালের বেড বাড়াই না।
হৃদরোগ এখন বাংলাদেশে মৃত্যুর প্রথম কারণ। প্রতি বছর ২ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ জন। কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি? শূন্য। ICU বেড মাথাপিছু ৩০ হাজার মানুষের জন্য একটা। থাইল্যান্ডে ৩ হাজারে একটা।
এই অবহেলা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটা রক্তে লেখা। প্রতিদিন রাকিবের মতো শত শত মানুষ মরছে। কেউ লেখে না। কেউ বলে না। কারণ আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
রাকিবের মৃত্যু সার্টিফিকেটে লেখা আছে “Myocardial Infarction”।
কিন্তু আমি জানি, সত্যিটা অন্য।
এটা হার্ট অ্যাটাক নয়।
এটা রাষ্ট্রীয় হত্যা।
এটা একটা দেশের নিজের সন্তানের প্রতি চরম অবহেলা।
এটা একটা ব্যবস্থার ব্যর্থতা, যে ব্যবস্থা মানুষের জীবনের চেয়ে কংক্রিটের সেতুকে বড় মনে করে।
আজ রাকিব নেই। কাল আরেকজন রাকিব যাবে।
কারণ আমরা চুপ আছি। কারণ আমরা গর্ব করি, আর ভুলে যাই।
আমি আর চুপ থাকব না।
রাকিব, তোর এই মৃত্যু বৃথা যাবে না।
তোর নামে, তোর বাচ্চাদের জন্য, এই দেশের প্রতিটি ৪৫ বছরের রাকিবের জন্য—
আমি লড়ব।
যতদিন বেঁচে থাকব, এই অবহেলার বিরুদ্ধে লড়ব।
যতদিন না এই দেশে একজন মানুষও বেডের অভাবে মরে।
#একটা_হৃদয়_থেমে_গেল
#CCU_তে_বেড_নেই
#স্বাস্থ্য_বাজেট_০_৯%
#প্রতিদিন_৫০০_হৃদরোগে_মৃত্যু
#রাষ্ট্রীয়_অবহেলায়_হত্যা
#আমার_বন্ধু_হলেও_বাঁচতো_না
#চিকিৎসা_অধিকার_চাই
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।