ছলনার আয়ু
(সত্য, বিবেক ও আত্মশুদ্ধি)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২৩ অক্টোবর ২০২৬
সত্যিকারের মুর্শিদ কেবল এমন একজন মানুষ নন, যাঁর কাছে কেউ আধ্যাত্মিক জ্ঞান কিংবা জীবনের দিশা খুঁজতে যায়। মুর্শিদ শব্দটি সুফি পরম্পরায় এমন পথপ্রদর্শককে বোঝায়, যিনি শিষ্যকে আত্মশুদ্ধি, সংযম ও সৎপথে চলার শিক্ষা দেন। তাঁর কাছে যাওয়ার অর্থ শুধু কিছু কথা শোনা নয়; নিজের ভেতরের দুর্বলতা ও অসংগতিগুলো চিনতে শেখারও চেষ্টা।
কিন্তু এখানেই মানুষের একটা অদ্ভুত দ্বন্দ্ব দেখা যায়। আমরা অনেক সময় এমন একজন মানুষের কাছে যাই, যাঁর কাছে নিজেদের ভুলগুলো স্বীকার করার কথা, অথচ তাঁর সামনেই নিজেদের সবচেয়ে ভালো রূপটি দেখাতে চাই। যে অভ্যাসগুলো বদলানো দরকার, সেগুলো আড়াল করি। যে কাজের জন্য অনুশোচনা হওয়ার কথা, তার পক্ষে যুক্তি সাজাই। কখনো অর্ধেক সত্য বলি, কখনো সুবিধামতো কিছু কথা বাদ দিই।
তারপর মনে করি, আমরা বুঝি ধরা পড়িনি।
কিন্তু যে মানুষটির কাছে নিজের ভেতরটাকে চিনতে এসেছি, তাঁর কাছেই যদি নিজের সত্য লুকাই, তাহলে সংশোধনের শুরুটা হবে কোথা থেকে?
ধরা যাক, একজন শিষ্য তাঁর মুর্শিদের কাছে এসে বললেন, তিনি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। সামান্য কথায় পরিবারের মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলেন। মুর্শিদ তাঁকে ধৈর্য ধরতে বললেন, নিজের আচরণ খেয়াল করতে বললেন। কয়েক দিন পর আবার দেখা হলে শিষ্য জানালেন, তিনি অনেকটাই বদলে গেছেন।
কিন্তু বাড়িতে ফিরে তিনি আগের মতোই রাগ করেন। ভুল স্বীকার করার বদলে পরিবারের মানুষকেই দোষ দেন। মুর্শিদের সামনে নিজেকে সংশোধিত হিসেবে তুলে ধরতে পারলেও নিজের আচরণে পরিবর্তন আনেন না।
এখানে তাঁর ক্ষতি শুধু এই নয় যে তিনি একজন পথপ্রদর্শকের কাছে সত্য গোপন করেছেন। আরও বড় ক্ষতি হলো, তিনি নিজের দুর্বলতাকে চিনে নেওয়ার সুযোগটাও নষ্ট করেছেন। যে সমস্যার সমাধান খুঁজতে এসেছিলেন, সেটাকেই আড়াল করে রেখেছেন।
অন্যকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা একসময় নিজের কাছেও মিথ্যা বলার অভ্যাস তৈরি করে। তখন মানুষ আর বুঝতে পারে না, সে সত্যিই বদলেছে, নাকি বদলে যাওয়ার একটা গল্প বিশ্বাস করতে শিখেছে।
অবশ্য একজন মুর্শিদও মানুষ। তাঁর জ্ঞান, বিচার কিংবা আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কোনো পথপ্রদর্শকের প্রতিটি কথাকে যাচাই ছাড়া মেনে নেওয়াই আত্মশুদ্ধি নয়। প্রকৃত শ্রদ্ধা মানে অন্ধ আনুগত্যও নয়। সত্যিকারের পথনির্দেশ মানুষকে বিবেকহীন করে না; বরং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে, নিজের কাজের দায় নিতে এবং ভুল হলে তা সংশোধন করতে শেখায়।
তাই মুর্শিদের সঙ্গে ছলনা না করার অর্থ এই নয় যে তাঁর সামনে ভয়ে সব কথা বলতে হবে কিংবা নিজের বিচারবুদ্ধি বিসর্জন দিতে হবে। অর্থ হলো, যাঁর কাছে নিজের উন্নতির জন্য গিয়েছ, তাঁর কাছে অন্তত নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সৎ থাকার চেষ্টা করো। যা পারোনি, তা পেরেছ বলে বোলো না। যে ভুল এখনো ছাড়তে পারোনি, সেটাকে ছেড়ে দিয়েছ বলে দাবি কোরো না।
সংশোধন না হওয়ার চেয়ে সংশোধনের পথে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করা অনেক বেশি সৎ কাজ।
আমরা প্রায়ই ভাবি, কোনো কাজের সত্য প্রকাশ পেলে তবেই তার পরিণতি শুরু হবে। অথচ অনেক সময় পরিণতি শুরু হয়ে যায় তারও আগে। মিথ্যা বলতে বলতে মানুষ নিজের কথার ওপর আস্থা হারায়। ভুল ঢাকতে গিয়ে আরও ভুল করে। সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। একসময় এমন অবস্থা আসে, যখন সত্য বললেও মানুষ আর সহজে বিশ্বাস করতে পারে না।
এই ক্ষতি কোনো প্রকাশ্য শাস্তির মতো নয়। বাইরে থেকে জীবন স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে বিশ্বাসের ভিত্তিটা দুর্বল হয়ে যায়।
তবে প্রতিটি গোপন কাজ একদিন সবার সামনে প্রকাশিত হবেই, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু কোনো কাজের নৈতিক মূল্য নির্ভর করে না সেটি প্রকাশ পেল কি না, তার ওপর। গোপনে করা অন্যায়ও অন্যায়, আর লোকচক্ষুর আড়ালে করা সৎ কাজও সৎ কাজ।
আসল প্রশ্ন তাই, কেউ দেখছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কেউ না দেখলেও আমরা নিজের কাজের দায় নিতে প্রস্তুত কি না।
একজন সত্যিকারের পথপ্রদর্শকের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্য যদি হয় নিজেকে একটু একটু করে বদলানো, তাহলে নিজের ভুল আড়াল করার চেয়ে তা স্বীকার করাই হবে প্রথম পদক্ষেপ। কারণ পথ দেখানো যায়, কিন্তু সেই পথে হাঁটার দায় অন্য কেউ নিতে পারে না। উপদেশ শোনা যায়, কিন্তু নিজের আচরণে তার প্রমাণ না থাকলে সেই শোনার মূল্যও সীমিত থেকে যায়।
জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নিজের সামনে নিজেরই দাঁড়াতে হয়। তখন কোনো অজুহাত কাজে আসে না, অন্যের ওপর দোষ চাপিয়েও স্বস্তি মেলে না। শুধু বোঝা যায়, কোথায় নিজের সঙ্গে অসততা করেছি এবং এখন কী বদলানো দরকার।
সেদিন অন্যকে কী বলেছিলাম, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে নিজেকে কী বলব, সেই প্রশ্ন।
মুর্শিদের সামনে নিজের ভুল আড়াল করে হয়তো কিছু সময় পার করা যায়; কিন্তু নিজের কাছে যে সত্য লুকিয়ে রেখেছি, তার মুখোমুখি হওয়ার সাহস কি আমাদের আছে?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।