খোঁচা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা। ১৭ অক্টোবর ২০২৬
অফিসের ঘরে সবাই বসে চা খাচ্ছিলাম। কথায় কথায় নিজের একটা কাজের কথা বলছিলাম। কাজটা নিয়ে আমি খুশি ছিলাম। অনেক দিন লেগেছিল শেষ করতে।
পাশ থেকে একজন হেসে বললেন, “বাহ, আপনার তো অনেক যোগ্যতা! এত কিছু জানেন, অথচ এত দিন কিছুই করতে পারলেন না!”
ঘরে হাসি উঠল।
আমিও হাসলাম। হাসতে হয়েছিল বলে হাসলাম, নাকি নিজের অস্বস্তিটা ঢাকতে, আজ আর মনে নেই। শুধু মনে আছে, চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চুপ করে গিয়েছিলাম। একটু আগেও যে কথাগুলো বলতে ভালো লাগছিল, সেগুলো হঠাৎ আর বলার মতো মনে হলো না।
চায়ের শেষ চুমুকটা খেয়ে কাপটা নামিয়ে রেখেছিলাম।
সেদিন বাড়ি ফিরে ঘটনাটা কাউকে বলিনি। এমন কিছু তো নয় যে বাড়িতে এসে আলোচনা করতে হবে! একটা কথা বলেছে, সবাই হেসেছে, আমিও হেসেছি। ভুলে যাওয়াই ভালো।
কিন্তু কিছু কথা মানুষ ভুলতে চাইলেই ভুলতে পারে না।
পরের কয়েক দিন অফিসে ওই মানুষটার সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি আগের মতোই কথা বলেছেন। আমিও উত্তর দিয়েছি। কোথাও কোনো ঝগড়া হয়নি, মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়নি। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝত না, আমাদের মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে।
বদলটা হয়েছিল আমার ভেতরে।
আগে কোনো কাজ ভালো হলে তাঁকে বলতাম। নতুন কিছু করার কথা ভাবলে আলোচনা করতাম। কোথাও ভুল হলে সেটাও লুকাতাম না। মনে হতো, মানুষটা আমার পরিচিত, কথা বলা যায়।
এখন আর বলি না।
কাজের কথা উঠলে যতটুকু দরকার, ততটুকুই বলি। নতুন কোনো পরিকল্পনার কথা জিজ্ঞেস করলে বলি, “দেখি, এখনো ঠিক করিনি।” ভালো কিছু ঘটলেও খবরটা তাঁর কাছে পৌঁছানোর তাড়া অনুভব করি না।
একদিন তিনি নিজেই বললেন, “আপনাকে আজকাল কিছু জিজ্ঞেস করলে ঠিকমতো বলেন না। কী হয়েছে?”
আমি হেসে বলেছিলাম, “কই, কিছু হয়নি তো!”
তিনি আর কথা বাড়াননি।
আমিও তাঁকে বোঝাতে যাইনি।
একটা সময় ছিল, নিজের ভালো খবর কাউকে বলতে পারলে আনন্দটা যেন একটু বেড়ে যেত। এখন বুঝি, সব মানুষের কাছে আনন্দের খবর নিয়ে যাওয়া যায় না। কেউ আপনার সঙ্গে খুশি হবেন, কেউ শুনে চুপ করে থাকবেন, আর কেউ হয়তো এমন একটা কথা বলবেন, যার পর থেকে নিজের আনন্দটাকেও ব্যাখ্যা করতে ইচ্ছে করবে না।
আমার পরিচিত সেই মানুষটি অবশ্য এখনো আগের মতোই আছেন। আড্ডায় ভালো কথা বলেন, অন্যের ভুল ধরেন, সুযোগ পেলেই কাউকে না কাউকে নিয়ে মজা করেন। সবাই তাঁর কথা শুনে হাসে। কখনো আমিও হাসি।
শুধু নিজের কথা বলি না।
মাঝেমধ্যে ভাবি, সেদিন তিনি কথাটা বলার পর যদি একবার আমার মুখের দিকে তাকাতেন! হাসির ভেতরেও যে মানুষ অস্বস্তি লুকাতে পারে, সেটা যদি বুঝতেন! হয়তো কিছুই বদলাত না। হয়তো পরক্ষণেই বলতেন, “আরে, মজা করলাম!”
কিন্তু আমার আর তাঁকে কিছু বোঝাতে ইচ্ছে করে না।
কারণ যে কথাটা বলার সময় তিনি ঘরের সবার হাসি শুনেছিলেন, সেই কথার পর আমার নীরবতাটা তিনি শুনতে পাননি।
আমাদের মধ্যে এখনো সম্পর্ক আছে। দেখা হলে কথা হয়, প্রয়োজনে যোগাযোগ হয়। কোনো অনুষ্ঠানে পাশাপাশি বসলে চায়ের কাপও এগিয়ে দিই। তিনি হয়তো ভাবেন, সব আগের মতোই আছে।
আমি তাঁকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টাও করি না।
শুধু নিজের জীবনের দরজাটা আর আগের মতো খুলে দিই না।
কয়েক দিন আগে অফিসে আবার চা খাওয়ার সময় তিনি জানতে চাইলেন, নতুন কোনো কাজ করছি কি না।
কাপের দিকে তাকিয়ে বললাম, “না, তেমন কিছু না।”
আসলে একটা কাজ শুরু করেছি। বেশ কিছু দিন ধরে করছি। শেষ হলে হয়তো অনেকেই জানবেন। তিনিও জানতে পারেন।
কিন্তু এবার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বলব না।
চায়ে চুমুক দিলাম। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
কাপটা নামিয়ে রেখে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম।
তিনি বুঝতেই পারলেন না, তাঁর সামনে বসে থাকা মানুষটা কত কিছু বলতে বলতে এখন আর কিছুই বলে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।