দেবতার চেয়ে ভয় কি পুরোনো?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানুষ প্রথমে ঈশ্বরকে ভালোবেসেছিল, নাকি অজানা জিনিসকে ভয় পেয়েছিল?
প্রশ্নটা সহজ।
উত্তরটা নয়।
কারণ ধর্মের শুরু কোথায়—এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ালে ইতিহাস খুব দ্রুত নীরব হয়ে যায়। লিখিত ইতিহাসের অনেক আগেই মানুষ আকাশ দেখেছে, বজ্রপাত দেখেছে, নদীর বন্যা দেখেছে। রোগে আপনজনকে হারিয়েছে। খরা এসে ফসল নষ্ট করেছে। ঝড় এসে ঘর ভেঙেছে। মৃত্যু এসেছে, কিন্তু কেন এসেছে—তার উত্তর ছিল না।
আমরা জানি না সেই মানুষগুলো তখন ঠিক কী ভাবত।
তবে এটুকু বোঝা যায়—মানুষ অজানার সামনে দাঁড়িয়ে চুপ করে থাকেনি।
সে প্রশ্ন করেছে।
বজ্রপাত কেন হলো?
বৃষ্টি কেন এলো না?
এই মানুষটি হঠাৎ মারা গেল কেন?
রোগটা কোথা থেকে এলো?
আজ এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর উত্তর আমরা অন্যভাবে খুঁজি। আবহাওয়ার বিজ্ঞান আছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান আছে, ভূতত্ত্ব আছে। কিন্তু কয়েক হাজার বছর আগে প্রকৃতির অনেক ঘটনাই ছিল মানুষের কাছে অনির্দেশ্য।
অজানা মানেই ভয়।
কিন্তু অজানা মানেই শুধু ভয় নয়।
সেখানে বিস্ময়ও আছে।
রাতের আকাশে অসংখ্য তারা দেখে মানুষ যেমন ভয় পেতে পারে, তেমনই মুগ্ধও হতে পারে। সূর্য প্রতিদিন ফিরে আসে—এটাও বিস্ময়ের। ঋতু বদলায়, বীজ মাটির নিচে হারিয়ে গিয়ে আবার গাছ হয়ে ওঠে—এটাও বিস্ময়ের।
তাই ধর্মকে শুধু ভয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
ভয় হয়তো সেখানে ছিল।
কিন্তু তার পাশে ছিল বিস্ময়, কৌতূহল, মৃত্যু নিয়ে ভাবনা এবং পৃথিবীকে অর্থপূর্ণ করে বোঝার চেষ্টা।
মৃত মানুষকে অনেক প্রাচীন সমাজে যেভাবে সমাধিস্থ করা হয়েছে, তার সঙ্গে দেওয়া জিনিসপত্র, দেহের অবস্থান কিংবা সমাধির ধরন দেখে গবেষকেরা কখনো কখনো বুঝতে চেষ্টা করেন—মৃত্যু সম্পর্কে মানুষ কী ধরনের ধারণা পোষণ করত।
কিন্তু এখানেও সরাসরি উত্তর নেই।
কোনো সমাধিতে মৃতের সঙ্গে কিছু বস্তু পাওয়া গেলেই আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না, “সে পরজীবনে এই জিনিস ব্যবহার করবে বলে এগুলো দেওয়া হয়েছিল।”
আমরা শুধু বলতে পারি—মৃতদেহকে মানুষ একটি বিশেষ উপায়ে আচরণ করেছে।
তার মধ্যে বিশ্বাসের কোনো চিহ্ন থাকতে পারে।
আবার অন্য কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কারণও থাকতে পারে।
ইতিহাসের সৌন্দর্য এখানেই—প্রমাণ আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, সবসময় উত্তর দেয় না।
তবু সময়ের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভেতর আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রশ্নটা শুধু প্রকৃতিকে নিয়ে থাকেনি।
মানুষ নিজের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন করতে শুরু করেছে।
কী করা উচিত?
কী করা উচিত নয়?
কোন কাজ ভালো?
কোন কাজ অন্যায়?
মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে?
মৃত্যুর পরে কী হতে পারে?
এই জায়গায় এসে ধর্ম শুধু অজানা শক্তিকে বোঝার চেষ্টা থাকে না। মানুষের জীবনকে অর্থ দেওয়ারও একটি কাঠামো হয়ে ওঠে।
জরথুস্ত্রীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে এই নৈতিক প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। আহুরা মাজদার সঙ্গে সত্য, প্রজ্ঞা ও সঠিকতার সম্পর্ক এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে নৈতিক দ্বন্দ্ব—এসব ধারণা মানুষের নিজের চিন্তা, কথা ও কাজের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসকে যুক্ত করেছে।
অর্থাৎ প্রশ্নটা শুধু—
“বজ্রপাত কেন হলো?”
আর থাকল না।
তার পাশে দাঁড়াল—
“আমি কীভাবে বাঁচব?”
এই পরিবর্তনটা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ প্রকৃতির সামনে মানুষের অসহায়তা তাকে অদৃশ্য শক্তির কথা ভাবতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সেই বিশ্বাস যখন মানুষের নিজের আচরণকে বিচার করতে শুরু করে, তখন ধর্মের ভেতরে আরেকটি জগত তৈরি হয়।
সেখানে থাকে প্রার্থনা।
থাকে নিষেধ।
থাকে আচার।
থাকে উৎসব।
থাকে পবিত্রতা ও অপবিত্রতার ধারণা।
আর থাকে ভালো ও মন্দের প্রশ্ন।
তবে ধর্মের ইতিহাসকে কোনো সরল সিঁড়ি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
প্রথমে ভয়, তারপর দেবতা, তারপর নৈতিকতা—সব সমাজে এমন ক্রমে ধর্ম তৈরি হয়নি।
কোথাও পূর্বপুরুষের স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। কোথাও উর্বরতা। কোথাও প্রকৃতির শক্তি। কোথাও মৃতদের সঙ্গে সম্পর্ক। কোথাও আবার নৈতিকতা ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলা ধর্মীয় চিন্তার কেন্দ্রে এসেছে।
মানুষের অভিজ্ঞতা এক ছিল না।
তাই “ভয় থেকেই ধর্মের জন্ম”—এই কথাটি শুনতে সুন্দর হলেও ইতিহাসের পক্ষে এটি খুব ছোট একটি বাক্য।
বরং বলা যায়, ভয় সেই দীর্ঘ মানবিক অনুসন্ধানের একটি অংশ হতে পারে।
অজানা মানুষকে ভয় দেখিয়েছে।
আবার সেই অজানাই তাকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে।
প্রশ্ন থেকে এসেছে ব্যাখ্যার চেষ্টা।
ব্যাখ্যা থেকে বিশ্বাস।
বিশ্বাসের সঙ্গে আচার।
আর সময়ের সঙ্গে সেই বিশ্বাসের ভেতর ঢুকে পড়েছে মানুষের নিজের জীবন—তার পরিবার, মৃত্যু, সমাজ, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ।
কিন্তু এই পুরো পথটাকে আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে দেখি।
সেই প্রথম মানুষটির কাছে ফিরে যেতে পারি না।
তার মুখ দেখতে পারি না।
সে বজ্রপাতের রাতে কী করেছিল, জানি না।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়েছিল কি না, জানি না।
হয়তো সে আগুনের পাশে বসেছিল।
হয়তো সন্তানকে কাছে টেনে নিয়েছিল।
হয়তো কোনো অদৃশ্য শক্তির কাছে প্রার্থনা করেছিল।
আবার হয়তো কিছুই করেনি।
শুধু তাকিয়ে ছিল।
অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই মানুষটির মনের ভেতর কী চলছিল, ইতিহাস তার উত্তর দেয় না।
কিন্তু তার প্রশ্নটা আজও আমাদের মধ্যে বেঁচে আছে।
“এই পৃথিবীতে যা ঘটছে, তার অর্থ কী?”
আর হয়তো তার অনেক পরে মানুষ আরেকটি প্রশ্ন করেছিল—
“এই পৃথিবীতে আমার কীভাবে বাঁচা উচিত?”
ধর্মের দীর্ঘ ইতিহাস হয়তো এই দুই প্রশ্নের মাঝখানেই কোথাও লেখা আছে।
তথ্যসূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকা — জরথুস্ত্রবাদ ও আহুরা মাজদা; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা — জরথুস্ত্রবাদ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।