নিজেকেই কেন্দ্র করে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ৪ অক্টোবর ২০২৬
কিছু মানুষ ঘরে থাকেন, অথচ ঘরের মানুষগুলোর সঙ্গে যেন থাকেন না। একই টেবিলে বসে খাওয়া হয়, একই সংসারের হিসাব চলে, অথচ কোথাও একটা দূরত্ব থেকেই যায়। তারা কথা বলেন, কিন্তু অন্যের কথা খুব একটা শোনেন না। নিজের কষ্ট সত্যি, নিজের অপমান বড়, নিজের প্রয়োজন জরুরি। অন্যের কষ্ট বা প্রয়োজন ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়।
এ ধরনের আচরণে নার্সিসিস্টিক প্রবণতা থাকতে পারে। তবে দু-একটি আচরণ দেখেই কাউকে নার্সিসিস্ট বলা ঠিক নয়। আত্মবিশ্বাসী হওয়া, নিজের সাফল্যে আনন্দ পাওয়া কিংবা নিজের মতকে গুরুত্ব দেওয়া স্বাভাবিক। বিষয়টি তখনই ভাবার মতো হয়, যখন নিজের গুরুত্ব এতটাই বড় হয়ে ওঠে যে অন্যের অনুভূতি, প্রয়োজন বা মর্যাদা বারবার তুচ্ছ হয়ে যায়।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে কাছের মানুষগুলোর ওপর।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো কথা নিয়ে মনোমালিন্য হয়েছে। স্ত্রী বললেন, “তোমার কথায় আমি কষ্ট পেয়েছি।”
উত্তর এল, “তুমি সবকিছুতেই বেশি সংবেদনশীল।”
এরপর আর তার কষ্ট নিয়ে কথা হলো না। আলোচনা ঘুরে গেল, তিনি কেন এত কিছু মনে করেন, কেন পুরোনো কথা টেনে আনেন, কেন সামান্য বিষয়কে বড় করেন। কিছুক্ষণ পর যে মানুষটি কষ্ট পেয়েছিলেন, তিনিই হয়তো ভাবতে শুরু করলেন, “আমি কি সত্যিই বাড়াবাড়ি করছি?”
দিনের পর দিন এমন হলে মানুষ একসময় নিজের অনুভূতিকেই সন্দেহ করতে শুরু করে। যে কথায় আগে কষ্ট লাগত, সেটাকে পরে স্বাভাবিক মনে হয়। প্রতিবাদ করার জায়গায় চুপ থাকাই সহজ লাগে।
পরিবারেও এর অন্য রূপ দেখা যায়।
একজন বাবা ছেলের ভালো রেজাল্টের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিয়ে লিখলেন, “আমার ছেলের জন্য গর্বিত।” সবাই প্রশংসা করল। অথচ আগের রাতে সেই ছেলেটাই পরীক্ষার ভয় নিয়ে বাবার পাশে বসেছিল। বাবা তখন ফোনে ব্যস্ত ছিলেন।
বাইরের মানুষ বাবার গর্ব দেখল। ছেলেটা মনে রাখল, তার ভয়টা কেউ শুনতে চায়নি।
বন্ধুত্বেও একই ঘটনা ঘটে। একজন বন্ধু চাকরি হারানোর কথা বলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর অন্যজন নিজের সমস্যার গল্প শুরু করে দিল। তারপর নিজের সংগ্রাম, নিজের কষ্ট, নিজের সাফল্য। যে মানুষটি কথা বলতে চেয়েছিল, সে চুপ হয়ে গেল।
কথোপকথন তখন আর দুজনের থাকে না। একজন বলছে, অন্যজন অপেক্ষা করছে কখন আবার নিজের কথাটা বলা যাবে।
“আজ অফিসে আমার কাজটার অনেক প্রশংসা হয়েছে।”
কথাটা শুনে হয়তো উত্তর এল, “আমার সময়ে তো তিন মাসের মাথায় প্রমোশন হয়েছিল।”
আবার কেউ বলল, “এই কয়েকদিন খুব খারাপ লাগছে।”
সামনের মানুষটি নিজের কষ্টের কথা বলতে শুরু করল, “আমার সমস্যাগুলো জানলে বুঝতে পারতে কষ্ট কাকে বলে।”
এভাবেই তৈরি হয় অদৃশ্য এক প্রতিযোগিতা—কার কষ্ট বেশি, কার সাফল্য বড়, কার কথা আগে শোনা হবে।
নার্সিসিস্টিক প্রবণতার সঙ্গে স্বীকৃতির এই তাগিদটিও থাকতে পারে। নিজের সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়া চাই, কিন্তু অন্যের সাফল্যকে জায়গা দেওয়া তখন কঠিন হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে এমন মানুষকে আবার বেশ আত্মবিশ্বাসী ও আকর্ষণীয়ও মনে হতে পারে। নতুন পরিচয়ে তাদের এই দিকটা ধরা কঠিন। সম্পর্ক যত গভীর হয়, ততই আচরণগুলো স্পষ্ট হতে থাকে।
তাই কাউকে তকমা দেওয়ার আগে বরং কিছু প্রশ্ন করা যায়।
ভুল হলে সে কি নিজের ভুল স্বীকার করে? অন্যের কষ্ট শুনে কি একটু থামতে পারে? “না” শুনলে কি সেটাকে সম্মান করে? আপনার ভালো কিছু হলে কি সত্যিই খুশি হয়? নাকি প্রায় প্রতিবারই কথাটা ঘুরে তার নিজের দিকে চলে যায়?
একটি-দুটি ঘটনার চেয়ে এসব আচরণ যদি নিয়মিত হয়, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
আর তখন অনেকেই ভাবেন, মানুষটাকে বুঝিয়ে বদলে দেবেন।
“আরেকটু ধৈর্য ধরলে বুঝবে।”
“কথাটা অন্যভাবে বললে হয়তো বুঝবে।”
“আমি নিজেই একটু বদলে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কখনো মানুষ বদলায়। কিন্তু তার জন্য নিজের আচরণ নিয়েও ভাবতে হয়। ভুল স্বীকার করতে হয়। অন্যের কষ্টকেও সত্যি বলে মেনে নিতে হয়। এই কাজটা একজন মানুষ একা করে ফেলতে পারে না।
তাই এমন সম্পর্কে নিজের জায়গাটাও মনে রাখা দরকার। সব কথার উত্তর দিতে হবে না। প্রতিটি অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে হবে না। কেউ আপনার কষ্টকে “বাড়াবাড়ি” বললেই সেটাকে সত্যি ধরে নেওয়ারও দরকার নেই।
নিজের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া মানে এই নয় যে আমি সবসময় ঠিক। আমিও ভুল করতে পারি। কিন্তু আমার কষ্টটা যে কষ্ট, সেটুকু বলার অধিকার অন্তত থাকা দরকার।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে, মানুষটি নার্সিসিস্টিক কি না।
আরও বড় প্রশ্ন হলো, তার সঙ্গে থাকতে থাকতে আপনি কেমন মানুষ হয়ে যাচ্ছেন?
আগের মতো কি নিজের কথা বলতে পারছেন? কষ্ট পেলে বলতে পারছেন? নাকি প্রতিটি কথা বলার আগে ভাবতে হচ্ছে, সে কীভাবে নেবে?
একসময় হয়তো খেয়াল করবেন, মানুষটি ঘরেই আছে। কথা বলছে, হাসছে, সংসারও চলছে। শুধু ঘরের অন্য মানুষগুলো তার পাশে থেকেও আর নিজেদের মতো নেই।
ঘরে থাকা আর ঘরের মানুষ হয়ে থাকা—দুটো এক জিনিস নয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।