বাংলা ভাষার স্বাধীন ব্যবহারের শৃঙ্খল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
গত শীতে আমার ভাগ্নে রাফিকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হলো একটি ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলে। সাত বছর বয়সে সে এখন "গুড মর্নিং" বলে ঘুম থেকে ওঠে, কিন্তু দাদুর সাথে কথা বলতে লজ্জা পায়—দাদু তো ইংরেজি বোঝেন না। এই লজ্জাটাই কি আমরা চাইছি? ভাষা আন্দোলনের ৭৩ বছর পর আমরা কি নতুন প্রজন্মকে তাদেরই ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছি না?
বাংলা ভাষা আমাদের জাতীয় পরিচয়, ঠিকই। কিন্তু পরিচয় যদি শুধু স্মৃতি ও উৎসবে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা মৃতপ্রায় ঐতিহ্যে পরিণত হবে। ভাষার সংকট আবেগের নয়—এটি কাঠামো ও প্রয়োগের সংকট।
ঐতিহাসিক গৌরব বনাম বাস্তব প্রয়োগের ফাঁক
ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, ঠিক। কিন্তু ১৯৫২-এর রক্ত যদি শুধু একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুলেল শ্রদ্ধায় পরিণত হয়, তবে সেই ত্যাগ বৃথা যাবে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি ভাষা আন্দোলনকে শুধু "শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া"য় রেখে দিতে চাই?
বাস্তবতা হলো, বাংলা এখনো প্রাত্যহিক জীবনের সর্বস্তরে কার্যকর ভাষা হয়ে ওঠেনি। আমরা বাংলায় কথা বলি, কিন্তু চিন্তা করি ইংরেজিতে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলার প্রাসঙ্গিকতা কমছে—কারণ ভাষা তাদের কাছে শুধু "পুরনো", "ঐতিহ্যবাহী" কিছু, নতুন নয়।
শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষাগত বিভাজন—এক জাতি, দুই ভাষা, দুই ভাগ্য
দেশে চারটি সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে—ইংরেজি-মাধ্যম, বাংলা-মাধ্যম, মাদরাসা ও কারিগরি। এই বিভাজন শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে নয়, সমাজে গভীর খাদ তৈরি করছে।
উচ্চবিত্ত শ্রেণি ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করে কর্মবাজারে সুবিধা পায়—এটি স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু বাংলা-মাধ্যমের অধিকাংশ শিক্ষার্থী কী অবস্থায়? তারা ১২ বছর পড়ার পরও বাংলায় সাবলীল পড়া-লেখা ও বোঝার দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—বাংলা বিষয়ে পাসের হার বেশি হলেও "দক্ষ" শিক্ষার্থীর হার নিচ্ছুণ। অর্থাৎ, পাস করা যায়, কিন্তু ভাষার সাথে পরিচয় হয় না।
কেন? পাঠ্যবইয়ে প্রায়োগিক অনুশীলনের অভাব। শিক্ষকরা নিজেরাই প্রশিক্ষণের অভাবে ভাষা শিক্ষার আধুনিক পদ্ধতি জানেন না। আর পরিবারে? গল্পের বইয়ের চেয়ে গাইডবই বেশি। ফলে একই জাতির মধ্যে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব বাড়ছে—একদিকে ইংরেজিতে স্বপ্ন দেখা প্রজন্ম, অন্যদিকে বাংলায় হতাশ প্রজন্ম।
বাজার অর্থনীতি ও ভাষার মর্যাদা—লাভের ভাষা কোনটি?
চাকরি, উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ—সবখানে ইংরেজি দক্ষতা সরাসরি আর্থিক সুবিধা দেয়। পরিবারগুলো তাই বাংলায় বিনিয়োগ কমায়। এটি কি অযৌক্তিক? না, বাস্তব। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি বাংলাকে কখনো জ্ঞান-উৎপাদনের ভাষা হিসেবে গড়ে তুলেছি?
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, কনটেন্ট ক্রিয়েশন—এই ক্ষেত্রগুলোতে বাংলার ব্যবহার বাড়ানো গেলে ভাষা আবেগের সীমানা ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক মূল্য পেত। কিন্তু আমরা সেটি করিনি। ফলে বাংলা শুধু "সুন্দর" ভাষা, "কাজের" নয়।
রাষ্ট্রনীতির প্রয়োগে দুর্বলতা—আইন আছে, অঙ্গীকার নেই
সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা বাংলা। 'বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭' আছে। হাইকোর্ট ২০১৪ সালে নির্দেশনা দিয়েছেন—উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় লিখতে হবে। তবু সরকারি নথিতে, উচ্চ আদালতের অনেক রায়ে, উচ্চশিক্ষার পাঠ্যে ইংরেজির প্রাধান্য রয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উচ্চ আদালতে বাংলা রায়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। 'আমার ভাষা' সফটওয়্যার চালু হয়েছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো দূর। মানসম্মত পরিভাষার অভাব, দক্ষ অনুবাদকের সংকট, শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব, ডিজিটাল টুলের সীমাবলী—এই বাধাগুলো কাটছে না।
সামাজিক মানসিকতা—আমরা ভাষাকে ভালোবাসি, কিন্তু চর্চা করি না
আমরা বাংলা ভাষাকে আবেগে ভালোবাসি, ঠিক। কিন্তু নিয়মিত চর্চা কই? সামাজিক মাধ্যমে খণ্ডিত, মিশ্র ভাষা বাড়ছে—"কি খবর?", "ভালো আছি", "লাভ ইউ বাংলা"। পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ায় লেখার গুণগত মানও হ্রাস পাচ্ছে।
পাঠক–লেখক–প্রকাশক–শিক্ষকের সক্রিয় চক্র না থাকলে ভাষার উন্নতি অসম্ভব। আমরা কি এই চক্রটি টিকিয়ে রেখেছি? নাকি শুধু "বাংলা ভাষা চিরজীবী হোক" স্ট্যাটাস দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছি?
সমাধানের বাস্তবসম্মত রূপরেখা
অভিন্ন কোর কারিকুলাম ও ভাষাদক্ষতা ফোকাস:
প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে বাংলায় পড়া-বোঝা-লেখার প্রায়োগিক অনুশীলন বাড়াতে হবে। শুধু ব্যাকরণ নয়, ভাষার ব্যবহার শিক্ষা দিতে হবে।
জাতীয় পরিভাষা কমিশনের সক্রিয়করণ:
প্রযুক্তি, আইন, চিকিৎসা, অর্থনীতিতে দ্রুত মানসম্মত বাংলা পরিভাষা তৈরি করতে হবে। "কম্পিউটার" নয়, "সংগণক"—এমন পরিভাষা জনপ্রিয় ও বাস্তবমুখী করতে হবে।
ডিজিটাল বাংলা অবকাঠামো:
ওপেন-সোর্স ফন্ট, স্পেল-চেক, ভয়েস-টু-টেক্সট, মেশিন ট্রান্সলেশন—এই ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোকে বিস্তৃত করতে হবে।
প্রশাসন ও আদালতে বাধ্যতামূলক বাংলা:
সরকারি নথি, সেবা ও রায়ে বাংলার প্রাধান্য নিশ্চিত করতে হবে। আইনের পূর্ণ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার।
জাতীয় পাঠাভ্যাস কর্মসূচি:
স্কুল লাইব্রেরি, বই ভাউচার, লেখক-পাঠক সভা, ডিজিটাল লাইব্রেরি প্রসার করতে হবে। শুধু পড়াশোনা নয়, পড়ার আনন্দ ফিরিয়ে আনতে হবে।
সাহিত্য-গবেষণায় তহবিল ও প্রণোদনা: মানসম্মত বাংলা গবেষণা, সৃজনশীল লেখা ও অনুবাদের জন্য অনুদান বাড়াতে হবে। ভাষা যেন শুধু "প্রকল্প" না হয়, "প্রেরণা" হয়।
স্মৃতি নয়, সম্ভাবনা
ভাষার সংকট আবেগের নয়, কাঠামো ও প্রয়োগের। শিক্ষায় দক্ষতা-কেন্দ্রিক সংস্কার, রাষ্ট্রীয় নীতির কঠোর বাস্তবায়ন, বাজারে প্রণোদনা ও সামাজিক চর্চার পুনরুজ্জীবন—এই স্তম্ভগুলো শক্তিশালী হলে বাংলা বিশ্বমানের কার্যকর ভাষা হয়ে উঠবে।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা তখনই পূর্ণ হবে, যখন বাংলা হবে জ্ঞান সৃষ্টি, প্রযুক্তি ব্যবহার ও দৈনন্দিন চিন্তার ভাষা—শুধু স্মৃতির নয়, সম্ভাবনা ও ক্ষমতারও।
আমার ভাগ্নে রাফি যেন একদিন দাদুর সাথে গর্বিতভাবে বাংলায় কথা বলতে পারে। সেটিই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধা—শহীদদের প্রতি, ভাষার প্রতি, নিজেদের প্রতি।
#বাংলা_ভাষা #ভাষার_স্বাধীনতা #শিক্ষা_সংস্কার
#ভাষা_অধিকার #সাংস্কৃতিক_চেতনা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।