হাসপাতালের করিডোর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ফেব্রুয়ারি ০১,২০২৬
মন্দির, মসজিদ বা গির্জার চেয়েও পবিত্র যে স্থানটির কথা আমরা খুব কম ভাবি, সেটা হলো হাসপাতালের করিডোর। প্রথমে কথাটা হয়তো একটু অবাক লাগলেও, ওই করিডোরে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেই বোঝা যায়—জীবন, মৃত্যু, আশা আর মানবতার সংযোগ আসলে কতটা বাস্তব এবং গভীর।
ধর্মীয় স্থানগুলোতে মানুষ বিধি মেনে প্রার্থনা করে, কিন্তু হাসপাতালের নির্জন করিডোরে মানুষ নিজেকেই সমর্পণ করে দেয়। এখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই। এই করিডোরে কেউ ধনী নয়, কেউ গরিবও নয়। সুট-বুট পরা কোটিপতি আর ছেঁড়া লুঙ্গি পরা ভিখারি—দুজনেই একই বেঞ্চে বসে, একই রকম অসহায়। সমাজে যতই পদমর্যাদা বা অর্থের প্রভাব থাকুক, এই করিডোরে সব বাধা বিলুপ্ত। সবার চোখে মুখে শুধু একটাই প্রার্থনা লেখা—প্রিয়জনটি যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসে।
অপারেশন থিয়েটারের (OT) বাইরের লাল বাতিটার নিচে দাঁড়ালে মানুষের আসল রূপটা ফুটে ওঠে। জীবনের মূল্য তখন অনুভূত হয় প্রতিটি নিঃশ্বাসে। আমরা যারা বাইরের জগতে নিজেদের অত্যন্ত দৃঢ় বা যুক্তিবাদী মনে করি, ওখানে গিয়ে পাথর হয়ে যায়। যে ব্যক্তি হয়তো সারাজীবন ঈশ্বরে বিশ্বাস করেনি, সেও ওই বদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অজানা এক শক্তির কাছে সাহায্য চায়। আর যে বাবাটা সারাজীবন শক্ত হয়ে কাজ করেছেন, তিনি ওখানে বাচ্চার মতো কান্না করে ফেলেন। এই দৃশ্যগুলো দেখলে বোঝা যায়, মানুষ আসলে ভয় পায়—প্রিয়জনকে হারানোর ভয়।
হাসপাতালের করিডোরকে আমি পবিত্র বলি কারণ, এটিই মানুষের সবচেয়ে সত্যিকারের রূপটি প্রকাশ করে। বাইরের পৃথিবীতে আমরা নিজেদের ভুল, দুর্বলতা বা ভয় নানা মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখি। কিন্তু এই করিডোরে কোনো মুখোশ টিকে না। অপরিচিত মানুষটার চোখের দিকে তাকালেও বোঝা যায়, সে কী যন্ত্রণায় আছে। এক অপরিচিত মানুষ অন্যজনের কান্না দেখে নিজের বুকটা চেপে ধরে বা একটা পানির বোতল এগিয়ে দেয়। এই যে অল্প সময়ের একটা সংযোগ, এটিই হলো আসল মানবতা।
দীর্ঘ সময় ধরে ওই করিডোরে বসে থাকার প্রভাব শুধু মানসিক নয়, শারীরিকভাবেও টের পাওয়া যায়। অতিরিক্ত উদ্বেগ আর অপেক্ষা মানুষকে শূন্য করে দেয়। খাওয়ার রুচি চলে যায়, ঘুম আসে না, বুক ধড়ফড় করে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ে ব্যথা হলেও কেউ বসতে চায় না, মনে হয় বসলে হয়তো কোনো খবর মিস হয়ে যাবে। ওই অস্থিরতা, ওই দমবন্ধ করা পরিবেশ—সব মিলিয়ে মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার অন্যদিকে নতুন করে বেঁচে থাকার তাগিদও জাগায়।
হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যখন আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরি, তখন অনেক কিছুর ব্যাখ্যা নিজে থেকেই পরিবর্তন হয়ে যায়। যা নিয়ে আমরা দিনরাত ঝগড়া করি, যা নিয়ে ইগো বা অহংকার করি—সবকিছুই হাসিমুখে তুচ্ছ মনে হয়। ওই করিডোর থেকে শেখা সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জীবনের আসল শক্তি টাকা বা পদমর্যাদায় নেই, তা নিহিত আছে ভালোবাসা আর একে অপরের প্রতি সদিচ্ছার মধ্যে।
জীবন অনেক ছোট, আর অনিশ্চিত। আজ হয়তো আমরা আছি, কাল নাও থাকতে পারি। তাই প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নিঃশ্বাসকে শ্রদ্ধা করা উচিত। হাসপাতালের করিডোর আমাদের সেই শিক্ষাটাই দেয়—অহংকার ভুলে মানুষ হিসেবে বাঁচতে শেখো।
#হাসপাতাল #মানবিক_অভিজ্ঞতা #জীবন_প্রার্থনা #মানবিক_সংযোগ #বাংলা_ব্লগ #বিশ্লেষণধর্মী #MentalHealthBangla #LifeLessons
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।