সত্যের সামনে
(যুক্তি, আত্মসমালোচনা ও মানুষের মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা |
২৩ অক্টোবর ২০২৬
একটি তর্কে দুজন মানুষ মুখোমুখি বসেছে। দুজনেরই বক্তব্য আছে, যুক্তি আছে, নিজের অবস্থানের পক্ষে বলার মতো কথাও আছে। একজন কথা শেষ করার আগেই অন্যজন উত্তর সাজিয়ে ফেলছে। কে কাকে থামিয়ে দিতে পারল, কার কথায় অন্যজন চুপ হয়ে গেল, কার যুক্তির সামনে উপস্থিত মানুষগুলো মাথা নাড়ল—ধীরে ধীরে তর্কের কেন্দ্র হয়ে উঠছে এসবই।
কিন্তু তর্ক শেষে একটা প্রশ্ন থেকে যায়—সত্যিই কি কেউ সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাল, নাকি একজন শুধু অন্যজনকে হারাতে পারল?
যুক্তি কিংবা তর্ক দিয়ে সাময়িকভাবে নিজেকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। মানুষের সামনে নিজের বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাও সম্ভব। কিন্তু প্রকৃত সত্যের কাছে পৌঁছানো এত সহজ নয়। সেখানে শুধু অন্যের ভুল খুঁজে পেলেই চলে না, নিজের ভুলগুলো দেখার সাহসও থাকতে হয়।
সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় সত্য জানতে চাই না; চাই নিজের কথাটাই সত্য প্রমাণিত হোক।
কোনো আলোচনায় কেউ আমাদের বক্তব্যের বিরোধিতা করলে আমরা প্রথমেই ভাবি, কীভাবে তার কথার জবাব দেওয়া যায়। সে যে কথাটি বলেছে, তার মধ্যে কোনো সত্য আছে কি না, তা ভেবে দেখার আগেই আমরা পাল্টা যুক্তি খুঁজতে শুরু করি। নিজের অবস্থান রক্ষা করতে গিয়ে কখনো এমন কথাও বলে ফেলি, যা শান্ত মাথায় ভাবলে নিজের কাছেই গ্রহণযোগ্য মনে হতো না।
তবু তর্কের মুহূর্তে আমরা থামতে চাই না। কারণ তখন বিষয়টি আর শুধু মতামতের থাকে না; তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় আত্মসম্মান, অহংবোধ আর অন্যের চোখে নিজের অবস্থান।
ধরা যাক, পরিবারের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে দুজনের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে। একজন বললেন, তাঁর সিদ্ধান্তে ভুল ছিল। অন্যজন সেই ভুলের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পুরোনো আরও কয়েকটি ঘটনা সামনে আনলেন। কথা বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় পৌঁছাল, যেখানে মূল সমস্যাটিই আড়ালে চলে গেল। একজন নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দিতে লাগলেন, অন্যজন প্রমাণ করতে চাইলেন যে তাঁর ধারণাই শুরু থেকে ঠিক ছিল।
শেষ পর্যন্ত হয়তো একজন চুপ করে গেলেন। বাইরে থেকে মনে হলো, অন্যজন জিতে গেছেন। কিন্তু যিনি চুপ করলেন, তিনি কি পরাজয় মেনে নিলেন? নাকি বুঝলেন, এই আলোচনায় নিজের কথা বলার আর কোনো অর্থ নেই?
নীরব হয়ে যাওয়া মানেই পরাজিত হওয়া নয়। অনেক সময় মানুষ যুক্তির অভাবে চুপ করে না, সম্পর্কের ক্ষতি এড়াতে চুপ করে। আবার কেউ কেউ নিজের বক্তব্যে দৃঢ় থেকেও অন্যের কথা শোনার সুযোগ দেন। এই দুই নীরবতার পার্থক্য আমরা সব সময় বুঝতে পারি না।
তর্কে জেতার আনন্দ আছে, কিন্তু নিজের ভুল বুঝতে পারার স্বস্তি অন্য রকম।
নিজের ভুল স্বীকার করা কঠিন কেন? কারণ আমরা শুধু নিজেদের সিদ্ধান্তকে ভালো মনে করি না, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজের পরিচয়ও জড়িয়ে ফেলি। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হলে মনে হয়, যেন আমাকেই ভুল প্রমাণ করা হচ্ছে। তখন ভুলটি সংশোধন করার বদলে নিজের পক্ষে আরও যুক্তি দাঁড় করাতে ইচ্ছা করে।
কখনো পুরোনো কোনো বিশ্বাসের পক্ষে এত দিন কথা বলেছি যে, নতুন তথ্য সামনে এলেও তা মেনে নিতে সংকোচ হয়। মনে হয়, আজ নিজের অবস্থান বদলালে অন্যরা ভাববে, এত দিন যা বলেছি, সবই ভুল ছিল। অথচ মানুষ নতুন কিছু জানার পর নিজের মত বদলাতেই পারে। বরং নতুন উপলব্ধির পরও শুধু পুরোনো বক্তব্য আঁকড়ে থাকা নিজের সঙ্গে অসততা করার মতো।
তবে আত্মসংশোধন মানে সব সময় অন্যের বক্তব্য মেনে নেওয়া নয়। কেউ জোর দিয়ে কিছু বললেই তা সত্য হয়ে যায় না। যুক্তি, তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে নিজের অবস্থানে অটল থাকাও জরুরি। কিন্তু সেই দৃঢ়তার সঙ্গে প্রশ্ন শোনার মানসিকতা থাকতে হবে। অন্যের বক্তব্য পরীক্ষা করার আগে নিজের বক্তব্যকেও একইভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে মানুষ বলতে পারে, “আমি বিষয়টি এভাবে বুঝেছিলাম, কিন্তু তোমার কথায় নতুন একটি দিক দেখতে পাচ্ছি।” আবার প্রয়োজন হলে বলতে পারে, “তোমার যুক্তি শুনেও আমি একমত হতে পারছি না।” এই দুই অবস্থানের কোনোটিই দুর্বলতার পরিচয় নয়। বরং নিজের বিশ্বাসের কারণ জানা এবং প্রয়োজনে তা পুনর্বিবেচনা করতে পারাই চিন্তার পরিপক্বতা।
আমরা অন্যের ভুল খুব সহজে দেখতে পাই। পরিচিত কারও আচরণে অসংগতি চোখে পড়লে দ্রুত বিচার করে ফেলি। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে একই ধরনের ভুল ঘটলে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা বদলে যায়। তখন বলি, বাধ্য হয়ে করেছি, পরিস্থিতি এমন ছিল, আমার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না।
অন্যের ভুলকে আমরা তার চরিত্র দিয়ে বিচার করি, নিজের ভুলকে পরিস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করি। এই দ্বৈত মানদণ্ডের কারণেই আত্মসমালোচনা এত কঠিন হয়ে ওঠে।
প্রকৃত সত্যের অনুসন্ধান শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ নিজের সুবিধাজনক ব্যাখ্যাগুলোকেও প্রশ্ন করতে শেখে। আমি যা বিশ্বাস করি, তা কেন বিশ্বাস করি? আমার ধারণার বিপক্ষে কোনো প্রমাণ আছে কি? অন্যের জায়গায় দাঁড়ালে ঘটনাটিকে কি অন্যভাবে দেখতে পারতাম? এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু সেই অস্বস্তি এড়িয়ে গেলে নিজের চিন্তার সীমাবদ্ধতাগুলোও অজানা থেকে যায়।
সব সত্য একদিনে ধরা দেয় না। কখনো অভিজ্ঞতা আমাদের পুরোনো ধারণা বদলে দেয়, কখনো কোনো মানুষের আচরণ নিজের বিচারবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবায়। আবার কখনো বহুদিন পর বুঝতে পারি, যে কথাটিকে একসময় অন্যায় মনে হয়েছিল, তার পেছনেও কিছু বাস্তবতা ছিল। এর অর্থ এই নয় যে সব পক্ষই সমানভাবে সঠিক। বরং অর্থ হলো, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে যতটা সম্ভব সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা দরকার।
কারণ সত্যকে নিজের পক্ষে দাঁড় করানোর চেষ্টা আর সত্যের সামনে দাঁড়ানোর মধ্যে বড় পার্থক্য আছে।
প্রথম ক্ষেত্রে আমরা চাই সত্য আমাদের বক্তব্যকে সমর্থন করুক। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আমরা প্রস্তুত থাকি, সত্য আমাদের ভুলও দেখিয়ে দিতে পারে।
দিন শেষে কেউ মনে রাখবে না আমি কটা তর্কে জিতেছি। কিন্তু মনে থাকবে, আমি ভুল বুঝেও চুপ করে ছিলাম কি না।
শেষবার যখন তর্কে জিতেছিলাম, তখন কি সত্যিই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছিলাম, নাকি শুধু নিজের ভুলটা দেখতে চাইনি?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।