প্রথম পর্ব (১/২)
বাংলা সাহিত্যে নারী সম্মানিত নাকি নান্দনিকভাবে নিয়ন্ত্রিত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
নিবন্ধ। এপ্রিল ০৬, ২০২৬
প্রায়শই দেখি বাংলা সাহিত্যের নারী চরিত্রকে "সম্মানিত" বলা হয়—তিনি ত্যাগী, সহনশীল, মমতাময়ী। কিন্তু এই সম্মান কি সত্যি তার স্বাধীনতার প্রতিফলন, নাকি এমন এক সূক্ষ্ম নির্মাণ যেখানে তাকে সুন্দর করে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে?
প্রথমে দুটি কথা বোঝা জরুরি
সম্মান মানে সামাজিক স্বীকৃতি—তাকে ত্যাগী, পতিব্রতা বলে প্রশংসা করা হয়। নান্দনিক নিয়ন্ত্রণ মানে সাহিত্যে তাকে এমনভাবে দেখানো হয় যে তার সীমাবদ্ধতাও সৌন্দর্য হয়ে ওঠে। তার নীরবতা হয়ে যায় গভীরতা, তার ত্যাগ হয়ে ওঠে মহত্ব। বেশিরভাগ সময় "সম্মান" দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু নির্দিষ্ট শর্তে—যদি সে ত্যাগী হয়, নীরব থাকে, সহ্য করে।
নারীর স্বাধীনতার পাঁচ স্তর
নারী চরিত্রের স্বাধীনতা বিচার করতে পাঁচটি স্তর ধরা যেতে পারে।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মানে নিজের পছন্দে বিয়ে বা সম্পর্ক করতে পারা।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মানে নিজের আয় থাকা।
শারীরিক স্বাধীনতা মানে নিজের শরীর ও যৌনতা নিয়ে নিজের মত থাকা।
রাজনৈতিক স্বাধীনতা মানে সংসার বা সমাজের বড় সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়া।
বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা মানে নিজের চিন্তা ও মতামত প্রকাশ করতে পারা। একটা চরিত্র যদি এক-দুটোতে স্বাধীন হয়, বাকিগুলোতে না—তাহলে তার "সম্মান" আসলে একটি নান্দনিক কারাগার।
বিখ্যাত চরিত্রগুলোর বিশ্লেষণ
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের "দেবদাস" উপন্যাসে পার্বতী দেবদাসকে ভালোবাসেন কিন্তু পারিবারিক চাপে কালীবাবুকে বিয়ে করতে বাধ্য হন। এখানে তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সম্পূর্ণ বলিদান করা হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পরও তিনি দেবদাসের সাথে সংসার করতে পারেননি—সমাজের নিয়ম তাকে বেঁধে রেখেছে। তার "ত্যাগ" আসলে বিকল্প না থাকার অবস্থা, সক্রিয় নির্বাচন নয়।
অন্যদিকে একই উপন্যাসের চন্দ্রমুখী পুরুষতান্ত্রিক সমাজে "সম্মান" হারালেও নিজের ইচ্ছায় চলেন। তিনি নিজের আয় করেন, দেবদাসের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন নিজের সিদ্ধান্তে। কিন্তু তার পরিণতি নেতিবাচক—এটি দেখায় যে সেই সমাজে নারীর জন্য "সঠিক" পথ ছিল না। পার্বতী "সম্মানিত" কিন্তু স্বাধীনতাহীন, চন্দ্রমুখী "অসম্মানিত" কিন্তু আংশিক স্বাধীন—দুজনের ভাগ্যেই দুঃখ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "ঘরে-বাইরে" উপন্যাসের বিমলা সন্দীপের আদর্শে আকৃষ্ট হন কিন্তু স্বামী নিকিলের প্রতি দায়বদ্ধতায় ফিরে আসেন। এখানে তার বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার চেষ্টা দেখা যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পুরনো কাঠামোতে ফিরে যান। রবীন্দ্রনাথের দ্বিধা প্রকাশ পায়—নারীর স্বাধীনতা কি সম্ভব, নাকি সমাজ তাকে শাস্তি দেবে?
অন্যদিকে "নৌকাডুবি" উপন্যাসের মৃণালিনী স্বামী হৃষিকেশের ত্রুটি সহ্য করেন কিন্তু নিজস্ব মর্যাদা ধরে রাখেন। তার নীরবতা শুধু সহনশীলতা নয়, এক ধরনের প্রতিরোধও। তিনি স্বামীর ভুল স্বীকার করিয়ে নেন নিজের উপস্থিতিতে, নিজের কথায় নয়।
পরের পর্বে:নারী লেখকরা কীভাবে কাঠামো ভাঙলেন—রোকেয়া, অশাপূর্ণা, মহাশ্বেতা, তসলিমা এবং পুরুষ লেখকদের ব্যতিক্রমধর্মী চিত্রায়ন।
(----চলবে----)
তথ্যসুত্রঃ
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন: "সুলতানার স্বপ্ন" (১৯০৫)
মহাশ্বেতা দেবী: "হাজার চুরাশির মা" (১৯৭৪)
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: "পদ্মা নদীর মাঝি" (১৯৩৬)
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: "দেবদাস" (১৯১৭)
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক: "নীচু শ্রেণির কণ্স স্বর উঠতে পারে কি?" (১৯৮৮)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।