ভালোবাসা আছে, প্রকাশ নেই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরন: বিশ্লেষণমূলক লেখা
তারিখ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬
একজন পুরুষ সব সময় তাঁর স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলতে পারেন না, তাঁকে কতটা ভালোবাসেন। কখনো রাগ করেন, কখনো অভিমান করে চুপ থাকেন, কখনো নিজের চিন্তায় এতটাই ডুবে যান যে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময়ও খুঁজে পান না। অথচ সেই নীরবতার আড়ালে কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে স্ত্রীকে হারানোর ভয়, সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা আর প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে হাজারটা দুশ্চিন্তা।
কিন্তু ভালোবাসার একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, মনের ভেতরে অনুভূতি যত গভীরই হোক, তা অন্য মানুষের কাছে সব সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। একজন স্বামী হয়তো মনে মনে স্ত্রীকে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি ভাবেন, অথচ তাঁর আচরণে সেই ভালোবাসার প্রকাশ খুঁজে পান না স্ত্রী। তখন একই ছাদের নিচে থেকেও দুজন মানুষের মধ্যে তৈরি হতে পারে অদৃশ্য দূরত্ব।
ভালোবাসা, অথচ প্রকাশের সংকোচ
অনেক পুরুষ ছোটবেলা থেকেই এমন পরিবেশে বড় হন, যেখানে আবেগ প্রকাশ করাকে দুর্বলতা মনে করা হয়। তাঁদের শেখানো হয়, কাঁদতে নেই, ভেঙে পড়তে নেই, নিজের কষ্টের কথা সবাইকে বলতে নেই। পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে, কঠিন পরিস্থিতিতে শক্ত থাকতে হবে, প্রয়োজন হলে নিজের ইচ্ছাকে চাপা দিয়ে অন্যদের জন্য কাজ করতে হবে।
বড় হয়ে এই অভ্যাস তাঁদের দাম্পত্য জীবনেও প্রভাব ফেলে। তাঁরা হয়তো স্ত্রীর জন্য পরিশ্রম করেন, সংসারের খরচ চালানোর চেষ্টা করেন, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ান। কিন্তু মুখে বলতে পারেন না, ‘তোমাকে হারানোর কথা ভাবলেও আমার ভয় লাগে’ কিংবা ‘তুমি পাশে থাকলে কঠিন সময়েও নিজেকে একা মনে হয় না।’
তাঁদের ধারণা, কাজের মধ্যেই ভালোবাসা প্রকাশ পেয়ে যায়। অথচ স্ত্রী হয়তো শুধু দায়িত্ব পালন নয়, ভালোবাসার কিছু শব্দও শুনতে চান। তিনি জানতে চান, তাঁর উপস্থিতি স্বামীর জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর কষ্ট স্বামী বুঝতে পারেন কি না, তাঁর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো স্বামীর কাছেও মূল্যবান কি না।
এখানেই তৈরি হয় ভুল বোঝাবুঝি। একজন ভাবেন, এত কিছু করার পরও ভালোবাসা প্রমাণ করতে হবে কেন? অন্যজন ভাবেন, ভালোবাসা থাকলে তা প্রকাশ করতে এত সংকোচ কেন?
রাগের আড়ালে কি সত্যিই ভালোবাসা থাকে?
কখনো কখনো একজন স্বামী নিজের ভয়, অসহায়ত্ব কিংবা মানসিক চাপ প্রকাশ করতে না পেরে রেগে যান। স্ত্রীর সামান্য কথায় বিরক্ত হন, অকারণে চুপ করে থাকেন কিংবা নিজের কষ্টের কথা না বলে দূরত্ব তৈরি করেন। পরে হয়তো একা বসে অনুশোচনা করেন, কিন্তু মুখ ফুটে ক্ষমা চাইতে পারেন না।
তবে সব রাগের আড়ালে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে না, আর নীরব থাকলেই কেউ গভীরভাবে ভালোবাসেন, এমনও নয়। ভালোবাসা কখনো রাগের কারণ হতে পারে, কিন্তু রাগ দিয়ে ভালোবাসার প্রমাণ দেওয়া যায় না।
স্ত্রীকে হারানোর ভয় থাকলে তাঁকে আরও যত্ন করে আগলে রাখা দরকার, ভয় দেখিয়ে নয়। অভিমান হলে কথা বলা দরকার, শাস্তি দেওয়ার মতো করে নীরব থেকে নয়। কারণ, যে নীরবতা সাময়িকভাবে মন শান্ত করে, সেই নীরবতাই দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সম্পর্কের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
ভালোবাসা শুধু অনুভব করার বিষয় নয়; এমনভাবে প্রকাশ করাও জরুরি, যাতে প্রিয় মানুষটি নিজেকে ভালোবাসার যোগ্য ও নিরাপদ মনে করেন।
স্ত্রীরও অনুভূতি আছে
অনেক সময় স্বামীর সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে স্ত্রীর অনুভূতিগুলো অজান্তেই আড়ালে চলে যায়। অথচ তিনিও অপেক্ষা করেন, অভিমান করেন, কষ্ট পান। স্বামী সারাদিন বাইরে থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরলে তিনি হয়তো নিজের অভিযোগগুলো চেপে রাখেন। স্বামী চুপ থাকলে তিনিও ভাবতে শুরু করেন, তাঁর প্রতি ভালোবাসা কি আগের মতো নেই?
তাই একজন পুরুষের নীরব কষ্ট বোঝার পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীর নীরবতাও বোঝা জরুরি। দাম্পত্য জীবন এমন কোনো সম্পর্ক নয়, যেখানে একজন শুধু অনুভূতি লুকিয়ে রাখবেন আর অন্যজন সবকিছু না বলতেই বুঝে নেবেন।
সম্পর্ক সুন্দর থাকে তখনই, যখন দুজন মানুষই নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগ পান। কখনো স্বামীকে বলতে হয়, ‘আমি তোমাকে হারাতে ভয় পাই।’ কখনো স্ত্রীকে বলতে হয়, ‘তোমার নীরবতা আমাকে কষ্ট দেয়।’ এই কথাগুলো দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার প্রমাণ।
শেষ কথা
একজন পুরুষ হয়তো মুখে খুব বেশি ভালোবাসার কথা বলেন না। কিন্তু দিনের শেষে স্ত্রীর মুখে হাসি দেখতে চান, তাঁর অসুস্থতায় চিন্তিত হন, সংসারের কঠিন সময়ে তাঁকে নিয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করেন। এসবের মধ্যেও ভালোবাসা থাকে। তবে সেই ভালোবাসাকে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তোলে আন্তরিক কথা, মন দিয়ে শোনা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন।
স্ত্রীকে হারানোর ভয় বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখার চেয়ে তাঁকে সেই ভয়ের কথা বলা ভালো। হয়তো আপনার কাছে কথাটি খুব সাধারণ, কিন্তু তাঁর কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে মূল্যবান আশ্বাস।
দায়িত্ব পালন করে সংসার টিকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু ভালোবাসার কথা না বললে সংসারটা শুধু দায়িত্বের জায়গা হয়ে থাকে, ভালোবাসার ঘর হয়ে ওঠে না।
মনে রাখতে হবে, একই ছাদের নিচে থাকা দুজন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু একসঙ্গে থাকা নয়, বরং একে অপরের কাছে নিজের অনুভূতিগুলো নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারা। কারণ, ভালোবাসা শুধু মনে অনুভব করার বিষয় নয়; প্রিয় মানুষটির মনেও সেই ভালোবাসার নিশ্চয়তা তৈরি করার নামই ভালোবাসা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।