নববর্ষের আলোয় অন্ধকার?
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ডিসেম্বর ২৯, ২০২৫
কল্পনা করুন, ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাত। আকাশ রঙিন আলোয় ভরে গেছে। বিকট শব্দে পটকা ফাটছে, আতশবাজি ছুটছে উপরে, ফানুস উড়ছে আকাশে। সবাই হাসছে, চিৎকার করছে, উল্লাস করছে। কিন্তু ঠিক ওই মুহূর্তেই, কোথাও একটা ছোট্ট পাখি হৃৎপিণ্ড ফেটে মারা যাচ্ছে। কোথাও একজন বৃদ্ধ শ্বাস নিতে পারছেন না। কোথাও একটা বাচ্চা কান চেপে কাঁদছে। আর কোথাও না কোথাও আগুন লেগে যাচ্ছে একটা বস্তি।
আমরা কি সত্যিই এই “উৎসবের” নামে এত বড় মূল্য দিতে রাজি?
আমরা বলি, “একদিন তো! কী এমন হবে?”
কিন্তু সেই একদিনেই ঢাকা শহরের বাতাসে পিএম ২.৫-এর মাত্রা সাধারণ দিনের তুলনায় ৫-১০ গুণ বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই ক্ষুদ্র কণাগুলো ফুসফুসে ঢুকে অ্যাজমা, হৃদরোগ, এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। যারা ইতিমধ্যে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন, তাদের জন্য এটা মৃত্যুর দুয়ার খুলে দেওয়া।
আর শিশুরা?
তাদের কচি ফুসফুসে এই বিষ ঢুকে যাচ্ছে চিরকালের জন্য। আমরা কি আমাদের সন্তানদের এমন উপহার দিচ্ছি নববর্ষের নামে?
শব্দদূষণের কথা তো বলাই হয় না। ১২০-১৫০ ডেসিবলের পটকার শব্দ মানুষের কানের পর্দা ফাটিয়ে দিতে পারে। বৃদ্ধ, হৃদরোগী, শিশু, গর্ভবতী মায়েরা – সবাই ঝুঁকিতে। কিন্তু সবচেয়ে করুণ অবস্থা পাখিদের। তাদের কান এত সংবেদনশীল যে, এই বিকট শব্দে তাদের হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার পাখি রাস্তায়, গাছের ডালে পড়ে থাকে মৃত।
গত কয়েক বছরে নববর্ষের পর সকালে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের রাস্তায় এমন দৃশ্য দেখা গেছে। যারা পাখি ভালোবাসেন, তারা কি কখনো ভেবেছেন – আমাদের আনন্দের জন্য এত প্রাণ যাচ্ছে?
আর ফানুস?
সুন্দর লাগে ঠিকই। কিন্তু ওই কাগজ আর তারের ফ্রেমে আগুন জ্বলে উঠে যখন নেমে আসে কোনো বস্তিতে, কোনো গাছে, কোনো বিদ্যুতের তারে – তখন কী হয়? প্রতি বছর নববর্ষের পর অগ্নিকাণ্ডের খবর আসে। বস্তিবাসী, যারা কোনোমতে বেঁচে আছেন, তাদের সব শেষ হয়ে যায় এক রাতে। আর যারা মারা যান, তাদের কথা ক’জন মনে রাখি?
আমরা বলি, “এটা তো আমাদের সংস্কৃতি।”
কিন্তু কোন সংস্কৃতি আমাদের শেখায় প্রাণের ক্ষতি করতে?
কোন উৎসবের অর্থ প্রকৃতিকে ধ্বংস করা?
আমরা কি ভুলে গেছি যে, নববর্ষ মানে নতুন শুরু, নতুন আশা?
তাহলে কেন আমরা শুরু করছি বিষ ছড়িয়ে, মৃত্যু ছড়িয়ে?
অথচ বিকল্প আছে। অনেক আছে। আকাশে আলোর পরিবর্তে আমরা জ্বালাতে পারি মোমবাতি, দীপ। গান গাইতে পারি, নাচতে পারি, একসঙ্গে বসে স্মৃতিচারণ করতে পারি। পারি গাছ লাগাতে। পারি প্রতিজ্ঞা করতে – এবারের নববর্ষটা হবে পরিবেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের। আমাদের সন্তানরা যেন দেখে, উৎসব মানে ধ্বংস নয়, সৃষ্টি।
আমি জানি, অনেকে বলবেন, “একা আমি কী করব?”
কিন্তু মনে রাখবেন, প্রতিটি পরিবর্তন শুরু হয় একজন মানুষ থেকে। যদি আপনি আজ পটকা না ফাটান, ফানুস না ওড়ান – তাহলে আপনার পাশের বাড়ির লোকজনও ভাববেন। একটা পোস্ট শেয়ার করুন, বন্ধুদের বলুন। ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তন আনে।
এবারের নববর্ষে আমরা প্রমাণ করি – আমরা আনন্দ করতে জানি, কিন্তু অন্যের কষ্টের ওপর দাঁড়িয়ে নয়। আমরা উৎসব করতে জানি, কিন্তু প্রকৃতির বুকে ছুরি মেরে নয়।
চলুন, এবারের নববর্ষটা সত্যিই নতুন হোক। পরিবেশকে বাঁচাই। প্রাণকে বাঁচাই। নিজেদের মানবিকতাকে বাঁচাই।
এবার পটকা-ফানুস নয়, ভালোবাসা আর সচেতনতাই হোক আমাদের উৎসবের আলো।
তথ্যসূত্র:
- বায়ুদূষণ বৃদ্ধি: WHO ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে নববর্ষে পিএম ২.৫ বহুগুণ বাড়ে (যেমন: Delhi/New Year pollution studies, একইভাবে ঢাকাতেও)।
- পাখির মৃত্যু: ভারত-বাংলাদেশে প্রতি বছরের রিপোর্ট (Animal Welfare Board ও স্থানীয় পরিবেশ সংগঠনের তথ্য)।
- অগ্নিকাণ্ড: ফায়ার সার্ভিসের বার্ষিক রিপোর্টে ফানুস-সংক্রান্ত আগুনের উল্লেখ থাকে।
#নববর্ষ২০২৬ #পটকামুক্তউৎসব #ফানুসনয়ভালোবাসা #পরিবেশবাঁচাও #পাখিবাঁচাও #সচেতননববর্ষ #গ্রিননিউইয়ার #বায়ুদূষণনয় #আমরাবদলাতেপারি
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।