সব চাপ নিতে হয় না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা। ৩ অক্টোবর ২০২৬
কখন মানুষ বুঝতে পারে যে সে ক্লান্ত?
সবসময় কোনো বড় ঘটনা ঘটে না। চাকরি চলে যায় না, সংসারে ঝগড়া হয় না, কাছের কেউ হারিয়েও যায় না। তবু কোনো এক রাতে বিছানায় শুয়ে মনে হয়, আজ কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। সারাদিন মানুষের মধ্যেই ছিলাম, কাজ করেছি, ফোন ধরেছি, প্রয়োজনীয় কথাগুলো বলেছি। বাইরে থেকে দেখলে দিনটা আর দশটা দিনের মতোই। শুধু নিজের ভেতরটা জানে, কোথাও একটা ভার জমেছে।
ছোটবেলা থেকেই আমরা শক্ত হতে শিখি। পড়ে গেলে উঠে দাঁড়াতে হবে, কষ্ট হলেও সামলে নিতে হবে, দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো যাবে না। কথাগুলো ভুল নয়। কিন্তু বড় হতে হতে সেই শিক্ষাই কখনো কখনো মানুষের ওপর আরেকটি চাপ হয়ে বসে। সংসার, সন্তান, বাবা-মা, চাকরি, অর্থের চিন্তা, সামাজিক প্রত্যাশা—সবকিছুর পাশে নিজের ক্লান্তিটাকে আমরা খুব সহজেই শেষের সারিতে ঠেলে দিই।
একজন মধ্যবিত্ত মানুষকে ‘না’ বলতে শেখানো হয় না। বরং বলা হয়, পারলে করে দাও। আত্মীয়ের প্রয়োজন হলে সময় দাও, পরিবারের দরকার হলে টাকা জোগাড় করো, অফিসে বাড়তি কাজ এলে মুখ ফিরিয়ে নিও না। নিজের প্রয়োজনটা পরে হলেও চলবে।
এই ‘পরে’ কথাটাই একসময় দীর্ঘ হয়ে যায়।
একজন মানুষকে দেখেছি, বছরের পর বছর নিজের প্রয়োজন পিছিয়ে দিতে দিতে এমন জায়গায় পৌঁছেছিলেন, যেখানে ফোন বেজে উঠলেও তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতেন। ফোন ধরতে তাঁর আপত্তি ছিল না, কিন্তু নতুন কোনো দায়িত্ব এসে পড়বে কি না, সেই আশঙ্কাটাই যেন তাঁকে ক্লান্ত করে দিত। একদিন বলেছিলেন, ‘সবাই ভাবে আমি সব পারি। আমিও এতদিন তাই ভাবতাম।’
কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু এর ভেতরে আমাদের জীবনের একটা বড় সত্যি আছে।
যে মানুষটি সবসময় দায়িত্ব নেয়, তার কাছেই আমরা আরও দায়িত্ব তুলে দিই। যে কখনো সাহায্য চায় না, ধরে নিই তার সাহায্যের দরকার নেই। যে মা সংসারের সবকিছু সামলে রাখেন, তাঁর ক্লান্তি নিয়ে প্রশ্ন করার প্রয়োজনও যেন আমরা মনে করি না। যে কর্মী রাত পর্যন্ত অফিসে থাকে, তাকে পরিশ্রমী বলা হয়; কেন তাকে প্রতিদিন এতটা চাপ নিতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নটা খুব কমই ওঠে।
চাপ নেওয়ার ক্ষমতা তখন আর শুধু ব্যক্তিগত সামর্থ্য থাকে না, হয়ে যায় সামাজিক প্রত্যাশা।
কিন্তু মানুষ তো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। বয়স বাড়ে, শরীর বদলায়, অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে, সম্পর্কের হিসাব বদলায়। যে মানুষটি কয়েক বছর আগে দশটা দায়িত্ব একসঙ্গে সামলেছেন, আজ হয়তো পাঁচটাতেই হাঁপিয়ে উঠছেন। তার মানে তিনি বদলে গেছেন, কিন্তু অযোগ্য হয়ে যাননি।
সমস্যা হলো, নিজের সীমাটা আমরা অন্যের চেয়ে নিজের কাছেই বেশি কঠিনভাবে বিচার করি।
ছুটির দিনে নিজের জন্য এক ঘণ্টা রাখতে গেলেও মনে হয়, সন্তানের সঙ্গে থাকা উচিত ছিল। অফিসের বাড়তি কাজটা নিতে না চাইলে মনে হয়, অন্যরা আমাকে কম দায়িত্বশীল ভাববে। কারও অনুরোধ ফিরিয়ে দিলে মনে হয়, সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাবে। নিজের জন্য একটু জায়গা রাখার মধ্যেও তাই অপরাধবোধ ঢুকে পড়ে।
এই ‘মানুষ কী ভাববে’ কথাটাই অনেকের জীবনে অদৃশ্য এক নিয়ন্ত্রক হয়ে থাকে।
তাই আমরা বিশ্রাম নিই তখনই, যখন শরীর আর কাজ করতে চায় না। মনকে সময় দিই তখনই, যখন মন নিজেই সবকিছু থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে।
অথচ সব দায়িত্ব একা বহন করাই দায়িত্বশীলতার একমাত্র প্রমাণ নয়। কোনো কাজ পরে করা যায়। কোনো ফোনের উত্তর দেরিতে দেওয়া যায়। পরিবারের কাউকে বলা যায়, ‘আজ তুমি এটা করে দাও।’ প্রয়োজনে সোজাসুজি বলা যায়, ‘এটা এখন আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
জীবনে সবকিছু নিখুঁতভাবে সামলানো সম্ভব নয়। কিছু কাজ অসম্পূর্ণ থাকবে, কিছু মানুষকে খুশি করা যাবে না, কিছু দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে। তাতে মানুষের মূল্য কমে যায় না।
সবসময় শক্ত থাকার অভিনয় করতে করতে যদি একদিন নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে যাই, তাহলে সেই শক্ত থাকার অর্থ কী?
হয়তো আমাদের শক্ত থাকার সংজ্ঞাটাই একটু বদলানো দরকার। সবকিছু সহ্য করে যাওয়ার নাম শক্ত থাকা নয়। কখনো নিজের সীমা মেনে নেওয়া, কখনো সাহায্য চাওয়া, কখনো চুপচাপ একটু সরে দাঁড়ানোও শক্ত থাকারই অংশ।
শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজের জীবনটা বাঁচে নিজের শরীর আর নিজের মনের ভেতর দিয়েই। অন্যেরা হয়তো তার দায়িত্বের হিসাব রাখবে, তার সাফল্য দেখবে, তার ব্যস্ততা নিয়ে কথা বলবে। কিন্তু গভীর রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে সে-ই জানবে, কতটা পথ আর হাঁটা সম্ভব।
তাই কোনো এক রাতে নিজের কাছে যদি বলতে হয়, ‘আজ আর পারছি না’, কথাটাকে ছোট করে দেখার কারণ নেই।
এই স্বীকারোক্তি হেরে যাওয়ার নয়। বরং অনেক সময় এখান থেকেই মানুষ আবার নিজের কাছে ফিরতে শুরু করে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।