জুতাটা আর কেনা হয়নি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২ অক্টোবর ২০২৬
রহিম সাহেব মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী একটা কথা বারবার বলছিলেন, “মানুষটা সংসারের জন্য অনেক করেছে। তখন বুঝিনি।”
কথাটা শুনে মনে হলো, আমাদের অনেক সংসারের গল্প হয়তো এমনই।
বেঁচে থাকতে একজন মানুষকে নিয়ে অভিযোগ থাকে, অভিমান থাকে, রাগ থাকে। তার আয় কম কেন, সময় কম কেন, এত দেরি করে বাড়ি ফেরে কেন, সন্তানকে আরও ভালো কিছু দিতে পারল না কেন—এসব নিয়ে কথা হয়। কিন্তু মানুষটা যখন আর থাকে না, তখন হিসাবটা যেন অন্যভাবে করা শুরু হয়।
তখন মনে পড়ে, মাসের শেষে তিনিই বাজারের টাকা গুছিয়েছেন। মেয়ের স্কুলের ফি দেওয়ার কথা তিনিই মনে রেখেছেন। বাবার ওষুধ শেষ হয়ে গেলে তিনিই কিনে এনেছেন। নিজের কোনো প্রয়োজন থাকলেও অনেক সময় সেটাকে পরে রেখেছেন।
জীবিত অবস্থায় এসব খুব একটা বড় ঘটনা মনে হয় না। কারণ কাজগুলো প্রতিদিনের।
সমস্যাটা সম্ভবত এখানেই।
কাছের মানুষের নিয়মিত দায়িত্বকে আমরা খুব সহজেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিই। একজন স্বামী আয় করবেন, সংসারের খরচ দেবেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববেন—এটাই যেন নিয়ম। ঠিকমতো করতে পারলে সেটা নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। কোনো মাসে আয় কমে গেলে, খরচ সামলাতে না পারলে, তখন সেই মানুষটির অক্ষমতাটাই সামনে চলে আসে।
অথচ আয়ের সঙ্গে শুধু টাকা আসে না। আসে দুশ্চিন্তাও।
চাকরিটা থাকবে তো? ব্যবসাটা এবার কেমন যাবে? মেয়ের কলেজে ভর্তি হলে খরচটা কোথা থেকে আসবে? হঠাৎ বাবা অসুস্থ হলে কী হবে? নিজের প্রয়োজনটা এবারও কি বাদ দিতে হবে?
এই প্রশ্নগুলোর অনেকটাই একজন পুরুষ কাউকে বলেন না। বলার অভ্যাস নেই। বাড়ি ফিরে মুখটা স্বাভাবিক রাখেন। স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে বলেন, “কিছু না।” সন্তান কিছু চাইলে নিজের চিন্তাটা সরিয়ে রেখে বলেন, “ঠিক আছে, ব্যবস্থা হবে।”
সব স্বামী অবশ্য এমন নন। কেউ সংসারে অবহেলা করেন, কেউ স্ত্রীকে অসম্মান করেন, কেউ আবার নির্যাতনও করেন। সেখানে চুপ থাকা কোনো সমাধান নয়। অন্যায় হলে প্রতিবাদ করতেই হবে।
কিন্তু রহিম সাহেবের মতো একজন মানুষকে বুঝতে গেলে শুধু তার দেওয়া টাকার হিসাব করলে হয়তো পুরো মানুষটাকে দেখা যায় না।
তার স্ত্রীও তো সংসার সামলাতেন। সন্তানদের দেখতেন, ঘরের কাজ করতেন, স্বামীর অনুপস্থিতিতে অনেক কিছু একাই সামলাতেন। দুজনের কাজের জায়গা আলাদা ছিল, কিন্তু সংসারটা চলত দুজনের পরিশ্রমেই।
তবু তাদের ঝগড়া হতো।
কখনো টাকার জন্য। কখনো দেরি করে বাড়ি ফেরা নিয়ে। কখনো স্ত্রীর অভিযোগ ছিল, “তুমি সংসারের জন্য সময় দাও না।”
রহিম সাহেবও হয়তো মনে মনে ভাবতেন, “আমি কি তাহলে কিছুই করছি না?”
এসব কথা তখন বড় মনে হতো। এখন আর সেগুলোর উত্তর দেওয়ার কেউ নেই।
আরও কষ্টের বিষয় ছিল, রাগের সময় বলা কিছু কথা ঘরের বাইরেও চলে যেত। আত্মীয়দের সামনে স্বামীর আয় নিয়ে ঠাট্টা, পুরোনো ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দেওয়া, সন্তানদের সামনে তাকে ছোট করা—এসব হয়তো মুহূর্তের রাগে বলা হয়েছিল।
রাগটা কেটে গিয়েছিল।
কথাগুলো থেকে গিয়েছিল।
তারপর একদিন রহিম সাহেব আর বাড়ি ফেরেননি।
শোকের কয়েকদিন পর তার স্ত্রী আলমারি গোছাতে গিয়ে একটা পুরোনো খাতা পেলেন। ভেতরে মাসের খরচের হিসাব। বাড়িভাড়া, বাজার, মেয়ের ফি, বাবার ওষুধ। এক পাশে ছোট করে লেখা—“এই মাসে নিজের জুতাটা পরে নেব।”
জুতাটা আর কেনা হয়নি।
খাতাটা হয়তো খুব সাধারণ একটা জিনিস। কিন্তু সেই পাতাগুলো দেখেই হয়তো বোঝা যায়, একজন মানুষ সংসারের জন্য কী কী সরিয়ে রেখেছিলেন, যার খবর অন্যরা সবসময় রাখেনি।
মৃত্যু কোনো মানুষকে ভালো বানিয়ে দেয় না। শুধু তার অনুপস্থিতিটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
যে মানুষটাকে প্রতিদিন দেখা যেত, তার জায়গাটা হঠাৎ এমনভাবে খালি হয়ে যায় যে পুরোনো অভিযোগগুলোর অনেকটাই অর্থ হারিয়ে ফেলে।
তখন মনে হয়, মানুষটাকে নিয়ে এত কথা ছিল। অথচ মানুষটার সঙ্গে কথা বলার সময়টা কি আমরা ঠিকমতো ব্যবহার করেছি?
রহিম সাহেবের স্ত্রী হয়তো এখনো মাঝে মাঝে রাগ করেন। পুরোনো অভিমানও মনে পড়ে। মানুষ তো একরঙা নয়। ভালোবাসার সঙ্গে ক্ষোভও থাকতে পারে, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে অভিযোগও থাকতে পারে।
শুধু একটা জিনিস আর বদলানো যাবে না।
যে কথাগুলো তখন বলা হয়নি, সেগুলো এখন আর তাকে শোনানো যাবে না।
রহিম সাহেবের স্ত্রী বলেছিলেন, “মানুষটা সংসারের জন্য অনেক করেছে। তখন বুঝিনি।”
মানুষটা তখন সামনে ছিল, অথচ আমরা তাকে পুরোপুরি দেখিনি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।